প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফয়সাল আহমেদ সুইট , রিপোর্টার ||
বিশ্বের বিভিন্ন
দেশে প্রায় এক কোটি ৩৯
লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের
বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের
বিভিন্ন দেশে কর্মরত। সরকারি
হিসাবে, ২০২৫ সালে প্রায়
১১ লাখ ২৮ হাজার
বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন।বিদেশে যাওয়া
কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছেন সৌদি
আরবে। গত বছর দেশটিতে
প্রায় সাড়ে সাত লাখ
বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কাতার, যেখানে গেছেন এক লাখের কিছু
বেশি শ্রমিক।তবে বিদেশে
কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও দক্ষতার ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য বড় বাধা
হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫
সালে বিদেশে যাওয়া মোট শ্রমিকের ৭৭
শতাংশই ছিলেন কম দক্ষ শ্রেণির।প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী
আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রতি
ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন,
বিদেশি নিয়োগকর্তারা যে ধরনের দক্ষতার
কর্মী চান, অনেক সময়
বাংলাদেশ থেকে সেই দক্ষতার
কর্মী পাঠানো হয় না।এই সমস্যা
কাটাতে নতুন পদ্ধতি চালুর
কথা জানিয়েছেন তিনি। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো দেশ নির্দিষ্ট
দক্ষতার কর্মী চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি বা প্রশিক্ষক বাংলাদেশে
এসে কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই
করবেন। তাঁরা সন্তুষ্ট হওয়ার পর কর্মী নিয়োগ
দেওয়া হবে।মন্ত্রী জানান,
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ
থেকে ছয় হাজার চালক
নেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে এমন পদ্ধতি চালু
হয়েছে।কোন
দক্ষতার কর্মীর চাহিদা বেশিঅভিবাসন খাতের
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশের কোন শ্রমবাজারে কী
ধরনের জনবলের চাহিদা রয়েছে, তা আগে চিহ্নিত
করা জরুরি। এরপর সেই চাহিদার
ভিত্তিতে সম্ভাব্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে বিদেশে কর্মসংস্থানের
সুযোগ আরও বাড়ানো সম্ভব।তাঁদের মতে,
কেয়ারগিভার, নার্স, চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীসহ
চাহিদাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে
সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশে এসব পেশার
কর্মীর চাহিদা আরও বাড়তে পারে।বর্তমানে সৌদি
আরবেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক
রয়েছেন। এ ছাড়া সংযুক্ত
আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সুদান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও জাপানসহ বিভিন্ন
দেশে বাংলাদেশিরা কাজ করছেন।গত ৯
জুলাই জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছিলেন,
আগামী পাঁচ বছরে বিদেশে
এক কোটি দক্ষ কর্মী
পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।সরকারিভাবে সারা
দেশে ১১০টি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫৫টি কর্মসংস্থান উপযোগী
স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে
দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।এ ছাড়া
নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান
তারেক রহমান ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখ
মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছিল।
এ জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা
ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেশব্যাপী সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও সেখানে উল্লেখ
করা হয়।দক্ষতার চিত্রজনশক্তি কর্মসংস্থান
ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সাবেক পরিচালক (প্রশিক্ষণ) নূরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া
শ্রমিকদের ৪৬ শতাংশই কম
দক্ষ ক্যাটাগরির।তাঁর দেওয়া
তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের
মধ্যে ১০ থেকে ১২
শতাংশ দক্ষ, ৪১ শতাংশ আধা
দক্ষ এবং ৪৬ শতাংশ
কম দক্ষ। এ ছাড়া ১
থেকে ২ শতাংশ কর্মী
পেশাদার পর্যায়ের।বিদেশে সাধারণত
বেসিক, মিড লেভেল ও
অ্যাডভান্সড এই তিন পর্যায়ের
কাজে কর্মসংস্থান হয়।বেসিক পর্যায়ের
কাজের মধ্যে নির্মাণ খাতের বিভিন্ন কাজ রয়েছে। এর
মধ্যে প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান ও মেকানিকের মতো
পেশা রয়েছে। এসব কাজেই বাংলাদেশ
থেকে বেশি শ্রমিক বিদেশে
যান।মিড লেভেলের
কাজের মধ্যে অটোমেকানিকস ও অ্যাডভান্সড ওয়েল্ডিংয়ের
মতো পেশা রয়েছে। আর
অ্যাডভান্সড পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রোগ্রামিং ও সাইবার নিরাপত্তার
মতো কাজে পেশাদার কর্মীর
চাহিদা ভালো বলে কর্মকর্তারা
জানিয়েছেন।প্রশিক্ষণে অগ্রগতি, তবে
স্বীকৃতির সংকটনূরুল ইসলাম
বলেন, বাংলাদেশি কর্মীরা বিদেশে প্রায় ২০০ ধরনের পেশায়
কাজ করেন। তবে তাঁদের বড়
অংশই অপেক্ষাকৃত নিচের স্তরের কাজে নিয়োজিত।তাঁর মতে,
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজের সুযোগই বাংলাদেশিরা বেশি পান।ইউরোপীয় ইউনিয়ন,
কানাডা ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায়
বাংলাদেশে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ কাঠামো
তৈরি হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা
রাখছে।নূরুল ইসলাম
বলেন, কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য এখন আন্তর্জাতিক
মানের কারিকুলাম রয়েছে এবং শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ
দেওয়া হয়েছে। ফলে বিদেশে যাওয়ার
আগে দক্ষতা অর্জনের প্রবণতা বেড়েছে।তবে বড়
সমস্যা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন
প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর সনদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার অভাব। তাঁর মতে, এসব
সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক
শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের অবস্থান আরও শক্ত হবে।কারিগরি প্রশিক্ষণে যেসব
কোর্সবিদেশে যেতে
ইচ্ছুক কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য গত এক
দশকে দেশের বিভিন্ন জেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।চাঁদপুর কারিগরি
প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শিরিন আক্তার বলেন, এসব কেন্দ্রে ড্রাইভিং,
ইলেকট্রিক্যাল কাজ, আইটি সাপোর্ট
ও কম্পিউটার, গ্রাফিকস ডিজাইন, সুইং মেশিন পরিচালনা,
নির্মাণকাজ, অটোমোবাইল, মেশিন টুলস অপারেশন, টেইলারিং
অ্যান্ড ড্রেস ফিটিং এবং জাপানি ভাষাসহ
বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।তিনি বলেন,
বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিরা নিজ
উদ্যোগে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে এসে পছন্দের কোর্সে
ভর্তি হন। আগের তুলনায়
বর্তমানে সম্ভাব্য বিদেশগামীরা বেশি সংখ্যায় এসব
কেন্দ্রে আসছেন।শ্রমবাজারভেদে প্রয়োজন ভিন্নবাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন
অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী
বলেন, একজন কর্মী কোন
দেশে এবং কী ধরনের
কাজে যেতে চান, তার
ওপর প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের ধরন
নির্ভর করে।তাঁর মতে,
বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে শিল্পনির্মাণ ও যান্ত্রিক কাজে
কর্মীর চাহিদা বেশি। বর্তমানে যান্ত্রিক ওয়েল্ডিংয়ের কর্মীর চাহিদাও বেশি।সৌদি আরবে
২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে রেখে ব্যাপক নির্মাণকাজ
শুরু হচ্ছে উল্লেখ করে আলী হায়দার
চৌধুরী বলেন, এতে দেশটির নির্মাণ
খাতে কর্মীর চাহিদা বাড়ার সুযোগ রয়েছে।অন্যদিকে ইউরোপের
শ্রমবাজারে কেয়ারগিভার ও কৃষি খাতের
প্রাথমিক কাজ জানা কর্মীর
চাহিদা বাড়ছে বলে জানান তিনি।জাপান ও
দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজের জন্য ভাষাজ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় জাহাজ নির্মাণ খাতে ওয়েল্ডিংয়ের কর্মীর
চাহিদা রয়েছে।আলী হায়দার
চৌধুরীর মতে, এসব কাজের
জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশি
কর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়বে। একই
সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে
তাল মিলিয়ে কর্মীদের প্রস্তুত করাও জরুরি।চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণেই সম্ভাবনাপ্রতিবছর বিপুলসংখ্যক
শ্রমিক বিদেশে পাঠালেও তাঁদের বড় অংশ কম
দক্ষ হওয়ায় আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে
না।অভিবাসন খাতের
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোন দেশে
কোন পেশার কর্মীর চাহিদা রয়েছে, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ
করে সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণের
ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি
প্রশিক্ষণ সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও নিশ্চিত করতে হবে।শ্রমবাজারের চাহিদা
অনুযায়ী কর্মী তৈরি করা গেলে
নির্মাণ, যান্ত্রিক কাজ, ওয়েল্ডিং ও
চালনার মতো প্রচলিত পেশার
পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতেও বাংলাদেশের কর্মীদের সুযোগ বাড়তে পারে।
সূত্র:
বিবিসি বাংলা