বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদগুলোর কথা আমরা সবচেয়ে বেশি শুনি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়। টেলিভিশনের পর্দা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পত্রিকার শিরোনামে তখন উঠে আসে উপকূলের মানুষের অসহায়ত্বের ছবি। কিন্তু দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর সেই মানুষগুলোর প্রতিদিনের সংগ্রাম খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপদ পানির, এছাড়াও কর্মসংস্থানের সংকট এবং নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকা।
খুলনা জেলার
দাকোপ উপজেলার লাউডোব ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের
বুড়ির ডাবর গ্রাম এমনই
একটি জনপদ। সুন্দরবনের একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত এই গ্রামের মানুষ
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই জীবন
কাটান। এখানকার অধিকাংশ পরিবার জীবিকার জন্য নির্ভরশীল সুন্দরবনের
ওপর। কেউ মধু সংগ্রহ
করেন, কেউ কাঁকড়া ধরেন,
কেউ কেওড়া ফল সংগ্রহ করে
বাজারে বিক্রি করেন। প্রতিটি আয়ের পেছনে রয়েছে
জীবনের ঝুঁকি। বাঘের আক্রমণ, কুমিরের ভয়, বিষধর সাপ,
নদীর উত্তাল স্রোত কিংবা আকস্মিক বৈরী আবহাওয়া-সবকিছুকে
উপেক্ষা করেই তারা বনে
যান। কারণ পরিবারের ভাতের
থালা তাদের অপেক্ষায় থাকে।
কিন্তু দিনের
পর দিন এমন ঝুঁকি
নিয়ে কাজ করা মানুষগুলোর
ঘরে ফিরে যদি এক
গ্লাস নিরাপদ পানি না থাকে,
তবে উন্নয়নের গল্প তাদের কাছে
কতটা অর্থবহ?
বুড়ির ডাবর
গ্রামের মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা বৃষ্টির
পানি। বর্ষাকালে যে পানি তারা
সংগ্রহ করতে পারেন, সেটিই
বছরের একটি বড় সময়
ব্যবহার করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু অধিকাংশ পরিবারের কাছে পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতার
পানির ট্যাংক নেই। কয়েকটি ট্যাংক
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে দেওয়া হলেও তা পুরো
গ্রামের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে বর্ষা শেষ
হওয়ার আগেই অনেক পরিবারের
সংরক্ষিত পানি ফুরিয়ে যায়।
এরপর শুরু হয় দূরের
উৎস থেকে পানি সংগ্রহের
কষ্টকর বাস্তবতা।
এই সংকট
শুধু পানির নয়, এটি সময়ের,
শ্রমের এবং স্বাস্থ্যের সংকট।
একটি পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিনের মূল্যবান সময় চলে যায়
শুধু পানি সংগ্রহ করতেই।
সেই সময় যদি শিক্ষা,
কৃষিকাজ, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড কিংবা পরিবারের অন্য প্রয়োজনীয় কাজে
ব্যয় করা যেত, তাহলে
তাদের জীবন হয়তো কিছুটা
হলেও বদলাতে পারত।
অন্যদিকে কর্মসংস্থানের
সংকট দিন দিন আরও
প্রকট হচ্ছে। বননির্ভর জীবিকার বাইরে বিকল্প আয়ের সুযোগ খুবই
সীমিত। ফলে বন বন্ধ
থাকলে কিংবা প্রাকৃতিক কারণে কাজ ব্যাহত হলে
অনেক পরিবার আয়হীন হয়ে পড়ে। খাদ্যসংকট
তখন বাস্তব হয়ে ওঠে। অনেক
পরিবারকে ধার-দেনা করে
সংসার চালাতে হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলের
মানুষের জীবনযাত্রা উন্নয়নে সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন
সংস্থা নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন
করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক
পরিবার নিরাপদ পানি, টেকসই কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত
সুবিধা থেকে বঞ্চিত। উন্নয়নের
সুফল যদি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
জনগোষ্ঠীর কাছে না পৌঁছায়,
তাহলে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা
পায় না।
বুড়ির ডাবর
গ্রামের মানুষের দাবি খুবই সাধারণ।
প্রতিটি পরিবারে একটি করে বৃষ্টির
পানি সংরক্ষণের ট্যাংক, নিরাপদ পানির টেকসই ব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের
সুযোগ। এসব দাবি কোনো
বিশেষ সুবিধা নয়, এগুলো একজন
নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
জলবায়ু পরিবর্তনের
অভিঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলের সংকট আরও জটিল
হচ্ছে। লবণাক্ততা বাড়ছে, সুপেয় পানির উৎস কমছে, জীবিকার
ওপর চাপ বাড়ছে। এই
বাস্তবতায় শুধু ত্রাণ বা
দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি
পরিকল্পনা, যেখানে নিরাপদ পানি, জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু সহনশীল
অবকাঠামোকে সমান গুরুত্ব দেওয়া
হবে।
সুন্দরবনকে রক্ষা
করার কথা আমরা প্রায়ই
বলি। কিন্তু সুন্দরবনের পাশেই যারা প্রজন্মের পর
প্রজন্ম বসবাস করছেন, সেই মানুষগুলোর জীবনমান
উন্নয়ন ছাড়া সুন্দরবন রক্ষার
লক্ষ্যও পূর্ণতা পাবে না। কারণ
এই মানুষগুলোই বনকে সবচেয়ে কাছ
থেকে জানেন, বনকে নির্ভর করে
বাঁচেন এবং বন টিকে
থাকলে তারাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হন।
উন্নয়ন
তখনই অর্থবহ হবে, যখন বুড়ির
ডাবরের কোনো মা তাঁর
সন্তানকে নিরাপদ এক গ্লাস পানি
দিতে উদ্বিগ্ন হবেন না। যখন
একজন বনজীবী জানবেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ শেষে
অন্তত তাঁর পরিবারের মৌলিক
চাহিদাগুলো নিশ্চিত থাকবে। উপকূলের মানুষের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতা
কেবল দুর্যোগের সময় নয়, বছরের
প্রতিটি দিনই সমানভাবে থাকা
উচিত। কারণ তারা শুধু
উপকূলের মানুষ নন, তারাও এই
দেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
লেখক পরিচিতি
কায়েস আহমেদ সেলিম
অনুসন্ধানী সাংবাদিক, দৈনিক যুগান্তর
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ভাইয়া ব্রডকাস্ট লিমিটেড