সৌদি-ইরান দুই সম্পর্কই রক্ষার চেষ্টা, হুথি হামলায় চাপে পাকিস্তান
সৌদি
আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির অঙ্গীকার রক্ষা এবং ইরানের সঙ্গে
সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সতর্কভাবে
এগোচ্ছে পাকিস্তান। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক
হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ইসলামাবাদের ওপর কূটনৈতিক চাপ
বাড়ছে। একদিকে সৌদি আরবকে নিরাপত্তার
নিশ্চয়তা দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে
ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে
দেশটি।এই
পরিস্থিতিতে পাকিস্তান তেহরানকে হুথিদের হামলা বন্ধে প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে সৌদি আরবের
নিরাপত্তায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেও ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক
অবস্থান নিয়েছে ইসলামাবাদ।সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে
সতর্কতাগত
১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খানকে সৌদি আরবে হুথিদের
হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে
তিনি জানান, তাৎক্ষণিকভাবে এ ধরনের কোনো
পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে
না। তবে প্রয়োজন দেখা
দিলে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।পাকিস্তানের
এই অবস্থানের লক্ষ্য হলো সৌদি আরবকে
নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া, কিন্তু একই সঙ্গে ইয়েমেনের
সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়িয়ে
চলা। ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে জানিয়েছে, এখনই কোনো সামরিক
প্রতিক্রিয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে সৌদি-পাকিস্তানগত
২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, মক্কা
ও মদিনার নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি
করা হলে তা পাকিস্তানের
কাছে ‘রেড লাইন’ হিসেবে
বিবেচিত হবে।একই
দিন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সৌদি
প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে
রিয়াদে বৈঠক করেন। সেখানে
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক
সমন্বয় এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা
একীভূত করার বিষয়ে আলোচনা
হয়।এরপর
৫ অক্টোবর সৌদি আরবে পাকিস্তান,
তুরস্ক ও সৌদি আরবের
প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। বৈঠকের
পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান,
ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা সহায়ক
ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তান
গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের
কাজে যুক্ত থাকলেও সরাসরি লড়াই করছে সৌদি
বাহিনী।তবে
পাকিস্তানের এই সহায়তা ঠিক
কোন এলাকায় দেওয়া হচ্ছে, কী ধরনের সরঞ্জাম
ব্যবহার করা হচ্ছে কিংবা
কতজন সেনা মোতায়েন রয়েছেন,
সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।ইরানের উদ্বেগ, হুথিদের পাল্টা হুঁশিয়ারিসৌদি
আরবে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতার খবর সামনে আসার
পর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইরান। গত ৪ অক্টোবর
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, সৌদি আরবে পাকিস্তান
ও তুরস্কের সেনা মোতায়েনের খবর
সত্য না হলেই তেহরান
স্বস্তি পাবে।পরে
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে কঠোর
প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দেশটির
তাসনিম সংবাদ সংস্থা পাকিস্তান ও তুরস্কের বিরুদ্ধে
সৌদি আরবের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার অভিযোগ
তুলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।তেহরানভিত্তিক
বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়ার মতে, সৌদি ভূখণ্ডের
নিরাপত্তায় প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতা ইরান মেনে নিতে
পারে। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে
সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপকে তেহরান সীমারেখা হিসেবে বিবেচনা করে।এদিকে
হুথি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি হুঁশিয়ারি
দিয়েছেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি
আরবকে সামরিক সহায়তা দিতে সরাসরি যুদ্ধে
জড়ালে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে হুথিদের
বক্তব্যে এখন পর্যন্ত এমন
ইঙ্গিত রয়েছে যে পাকিস্তান ও
তুরস্ক সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না।ইরানের সঙ্গে
আলোচনার পথও
খোলা
রাখছে
পাকিস্তানসামরিক
সহযোগিতার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে
চাইছে ইসলামাবাদ। গত ২ অক্টোবর
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানান, জাতিসংঘের
সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস
আরাগচির সঙ্গে আলোচনায় সৌদি আরবের সঙ্গে
প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি।ইসহাক
দারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান হুথিদের সঙ্গে
রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ সমাধানের একটি ধারণা সামনে
এনেছে। তবে এটি দুই
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রাথমিক আলোচনা ছিল, কোনো লিখিত
প্রস্তাব নয়।পাকিস্তানের
দাবি, ইরানের নেতারাও হুথিদের সঙ্গে বিরোধের অবসান চান। এ বিষয়ে
তেহরান প্রকাশ্যে আপত্তি জানায়নি।এর
আগেও একই ধরনের ভারসাম্য
রক্ষার চেষ্টা করেছে পাকিস্তান। গত মার্চে ইসহাক
দার জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবের প্রতি
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের বিষয়টি তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে
স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। জবাবে ইরান আশ্বাস চেয়েছিল,
সৌদি ভূখণ্ড যেন তেহরানের বিরুদ্ধে
হামলা চালানোর কাজে ব্যবহার না
করা হয়।অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাবসৌদি
আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কেবল সামরিক সহযোগিতার
মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তানের অর্থনীতি
সৌদি আর্থিক সহায়তা এবং দেশটিতে কর্মরত
প্রবাসী পাকিস্তানিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপরও নির্ভরশীল। অন্যদিকে,
ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে আঞ্চলিক নিরাপত্তা
ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি
হতে পারে।বিশ্লেষকদের
মতে, ইসলামাবাদের সামনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য রয়েছে—সৌদি আরবের নিরাপত্তা
রক্ষা, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং
ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়ানো।তবে
হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবের পক্ষ
থেকে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর চাপও বাড়তে পারে।
সে ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ কতটা প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতায়
সীমাবদ্ধ থাকবে, আর কতটা সরাসরি
সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, তা নির্ভর করবে
পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথের ওপর।সৌদি
আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার রক্ষা এবং ইরানের সঙ্গে
সম্পর্ক বজায় রাখার এই
প্রচেষ্টা তাই মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান
সংকটে পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ
কূটনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।সূত্র:
রয়টার্স ও এনডিটিভি
১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম