সৌন্দর্য আছে, পর্যটনের অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের
পর্যটনের কথা উঠলেই কক্সবাজারের
সমুদ্রসৈকত, সেন্ট মার্টিনের নীল জল, বান্দরবানের
পাহাড় কিংবা সিলেটের চা-বাগনের কথা
মনে আসে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের
দিক থেকে বাংলাদেশের ঘাটতি
নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটনের বড় প্রশ্নটি অন্য
জায়গায়- এই সৌন্দর্যকে ঘিরে
আমরা কতটা নিরাপদ, সহজ
ও মানসম্মত ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা দিতে পারছি?আন্তর্জাতিক
অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু আকর্ষণীয় গন্তব্য
পর্যটক টানে, কিন্তু উন্নত সেবা ও অবকাঠামো
তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনে।
তাই পর্যটনকে শুধু বিনোদন নয়,
বরং নিরাপত্তা, যোগাযোগ, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি
সমন্বিত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে দেখতে
হবে।নিরাপত্তা
আগে, অবকাঠামো পরেপর্যটকের
আস্থার প্রথম শর্ত নিরাপত্তা। এরপর
আসে অবকাঠামো। বিমানবন্দর থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো,
নিরাপদ সড়ক, মানসম্মত আবাসন,
চিকিৎসাসুবিধা, ইন্টারনেট, পরিচ্ছন্নতা এবং জরুরি সহায়তা-সবকিছু মিলেই তৈরি হয় একটি
পর্যটন অভিজ্ঞতা।সিঙ্গাপুর,
সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড
ও মালদ্বীপের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পর্যটনের
বিকাশে নিরাপত্তার পাশাপাশি বিমানবন্দর, সড়ক, নৌপথ ও
পর্যটকবান্ধব সেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশেও
একইভাবে পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি। কক্সবাজারে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত থাকলেই হবে না; সেখানে
সহজ যাতায়াত, মানসম্মত আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পর্যটন
পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।বিমানবন্দরই
প্রথম পরিচয়আন্তর্জাতিক
পর্যটকের কাছে বিমানবন্দর একটি
দেশের প্রথম পরিচয়। দ্রুত ইমিগ্রেশন, সহজ যাতায়াত, পর্যাপ্ত
তথ্যসেবা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তাই গুরুত্বপূর্ণ।সিঙ্গাপুরের
চাঙ্গি বিমানবন্দর কিংবা ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর দেখিয়েছে, বিমানবন্দর কীভাবে পর্যটন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠতে
পারে। বাংলাদেশের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আধুনিকায়নের পাশাপাশি কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি
গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।একই
সঙ্গে সিলেট, চট্টগ্রাম ও যশোর বিমানবন্দরকে
আঞ্চলিক পর্যটন প্রবেশদ্বার হিসেবে উন্নত করা প্রয়োজন।সড়ক-রেল-নৌপথে সংযোগবিমানবন্দর
পর্যটককে দেশে আনে, কিন্তু
সড়ক, রেল ও নৌপথ
তাকে পৌঁছে দেয় গন্তব্যে। তাই
পর্যটনের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার সম্পর্ক সরাসরি।ঢাকা–চট্টগ্রাম–কক্সবাজার করিডরের পাশাপাশি ঢাকা–সিলেট এবং
পার্বত্য এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে নিরাপদ
ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করে
তুলতে পারে।বাংলাদেশের
নদী ও উপকূলও পর্যটনের
বড় সম্পদ। মহেশখালী, সেন্ট মার্টিন, কুতুবদিয়া, নিঝুম দ্বীপ ও কুয়াকাটাকে ঘিরে
নিরাপদ নৌপরিবহন, আধুনিক টার্মিনাল ও ডিজিটাল টিকিটিং
চালু করা গেলে নতুন
সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।স্মার্ট
পর্যটনের সময়আধুনিক
পর্যটক শুধু সুন্দর জায়গা
দেখতে চান না; তিনি
চান নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি, দ্রুত ইন্টারনেট, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সহজ তথ্যসেবা।কক্সবাজার,
সিলেট, বান্দরবান ও কুয়াকাটাকে পর্যায়ক্রমে
‘স্মার্ট ট্যুরিজম জোন’ হিসেবে গড়ে
তোলা যেতে পারে। ডিজিটাল
সাইনেজ, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, মোবাইল অ্যাপ, স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।শুধু
দর্শন নয়, অভিজ্ঞতাওপর্যটনের
ধরন বদলেছে। এখন পর্যটক শুধু
একটি দর্শনীয় স্থান দেখে ফিরে যেতে
চান না; তিনি স্থানীয়
খাবার, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, বিনোদন ও অ্যাডভেঞ্চারের পূর্ণাঙ্গ
অভিজ্ঞতা চান।কক্সবাজারে
সমুদ্রভিত্তিক বিনোদন, বান্দরবানে অ্যাডভেঞ্চার, সিলেটে প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন এবং সোনারগাঁও-পাহাড়পুরে
সাংস্কৃতিক পর্যটন—এভাবে গন্তব্যভিত্তিক অভিজ্ঞতা তৈরি করা যেতে
পারে। এর সঙ্গে মানসম্মত
হোটেল, ইকো-লজ, রিসোর্ট,
চিকিৎসাকেন্দ্র ও বিনোদন অবকাঠামো
যুক্ত করা প্রয়োজন।বিনিয়োগে
সরকার-বেসরকারি অংশীদারত্ববড়
পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে সরকারি
ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় প্রয়োজন। সরকারের দায়িত্ব হবে নীতি, নিরাপত্তা,
জমি, পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো
নিশ্চিত করা। অন্যদিকে বেসরকারি
ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আনতে পারেন পুঁজি,
প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক বিপণন
দক্ষতা।তবে
উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশ
ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। ক্যারিয়িং ক্যাপাসিটি, জোনিং ও পরিবেশগত বিধিমালা
মেনে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলাই টেকসই
পথ।প্রয়োজন
সুস্পষ্ট রোডম্যাপবাংলাদেশের
পর্যটনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত
মাস্টারপ্ল্যান। প্রথমে বিমানবন্দর, সড়ক, রেল, নৌপথ,
পানি, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সেবার
ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে। এরপর
অগ্রাধিকারভিত্তিতে অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটনকেন্দ্রিক আবাসন ও বিনোদনসুবিধা এবং
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।এর
পাশাপাশি ইকো-ট্যুরিজম, স্মার্ট
ট্যুরিজম ও সামুদ্রিক পর্যটনের
জন্য পৃথক পরিকল্পনা নেওয়া
যেতে পারে।সৌন্দর্যের
সঙ্গে সক্ষমতাবাংলাদেশের
পর্যটন সম্ভাবনার ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে
সেই সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে।নিরাপত্তা
পর্যটকের আস্থা তৈরি করে, আর
অবকাঠামো সেই আস্থাকে অভিজ্ঞতায়
রূপ দেয়। তাই কক্সবাজার,
সেন্ট মার্টিন, বান্দরবান, সিলেট, কুয়াকাটা ও মহেশখালীকে শুধু
দর্শনীয় স্থান হিসেবে নয়, পরিকল্পিত পর্যটন
গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।বাংলাদেশের
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের সম্পদ; এখন প্রয়োজন সেই
সম্পদের সঙ্গে আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও মানসম্মত সেবার
সমন্বয়। তাহলেই পর্যটন জাতীয় অর্থনীতির আরও গুরুত্বপূর্ণ খাতে
পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম