মার্কিন আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল নয় ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
ও টানা ছয় মাসের
যুদ্ধের চাপের মধ্যেও নিজেদের সক্ষমতার ওপর ভর করে
অর্থনীতি সচল রাখার বার্তা
দিয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। তবে একই সঙ্গে
দেশটির সরকার সতর্ক করেছে, সামনে সাধারণ মানুষকে তীব্র আর্থিক সংকট ও কঠিন
জীবনযাত্রার মুখোমুখি হতে হতে পারে।ওয়াশিংটনের চাপের
জবাবে তেহরান বলছে, বিশ্ব আর এককভাবে মার্কিন
আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল নয়।
নিজেদের কৌশলে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি পাল্টা অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।ইরানের অর্থমন্ত্রী
আলী মাদানিজাদেহ সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দুই বছর মেয়াদি
একটি বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর
ভাষ্য, বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা
মোকাবিলা ও তা এড়িয়ে
চলার কৌশল ইরানের জানা
রয়েছে।দেশটির কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেমমাতিও ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের
প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস তেল
রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও
জরুরি পণ্য আমদানির জন্য
রিজার্ভে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা ও সোনা রয়েছে।
এসব মজুত যুক্তরাষ্ট্রের নাগালের
বাইরে বলেও দাবি করেন
তিনি।তবে অনিয়ন্ত্রিত
মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা
কমে যাওয়াকে বড় সংকট হিসেবে
স্বীকার করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। সরকার খাদ্যসামগ্রী ও জরুরি পরিষেবাকে
রেশনিংয়ের আওতায় আনলেও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এখনো ধসে পড়েনি
বলে দাবি তাঁর।রেকর্ড
দরপতন ইরানি রিয়ালেরঅর্থনৈতিক সংকটের
বড় প্রভাব পড়েছে তেহরানের খোলা বাজারে। সেখানে
মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মূল্য এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন
পর্যায়ে নেমে ২০ লাখ
৫০ হাজার রিয়ালে দাঁড়িয়েছে।এদিকে দেশের
অভ্যন্তরীণ দারিদ্র্য পরিস্থিতির তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও
বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এ ধরনের তথ্য প্রকাশের আগে
নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা জারি করা হয়েছে।এই পরিস্থিতিতে
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজায়ি তরুণদের ঘরে বসে দৈনন্দিন
প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন এবং
ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে যুক্ত হওয়ার
আহ্বান জানিয়েছেন।খাদ্যে
আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য, আছে চ্যালেঞ্জইরানের কৃষিমন্ত্রণালয়
দেশের খাদ্য চাহিদার ৯০ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে
উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে গম, চাল
ও ভোজ্যতেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের
ক্ষেত্রে এখনো মধ্যপ্রাচ্য ও
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের
নির্ভরতা রয়েছে।এর সঙ্গে
তীব্র পানি সংকট যুক্ত
হওয়ায় কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর
উদ্যোগও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।ওষুধ
ও বিদ্যুৎ খাতেও সংকটখাদ্যের পাশাপাশি
স্বাস্থ্য খাতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইরান
প্রায় ৯৭ শতাংশ ওষুধ
দেশে উৎপাদন করে বলে দাবি
করলেও অন্তত ১ হাজার ধরনের
ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।সরকার ভোজ্যতেল
ও ওষুধ আমদানির জন্য
দেওয়া সস্তা বৈদেশিক মুদ্রার ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে ওষুধের দামও দ্রুত বাড়ছে।অন্যদিকে যুদ্ধের
কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর
প্রভাব পড়েছে দেশটির বড় শহরগুলোতে। তেহরানসহ
বিভিন্ন শহরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট
বেড়েছে। একই সঙ্গে পেট্রোল
পাম্পগুলোতে তৈরি হচ্ছে কিলোমিটারজুড়ে
দীর্ঘ সারি।দীর্ঘমেয়াদি
যুদ্ধে বাড়ছে চাপঅর্থনীতিবিদদের একাংশ
সতর্ক করেছেন, ভেনেজুয়েলার মতো বড় ধরনের
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
এড়াতে ইরান সরকারকে জ্বালানির
দাম বাড়ানোর মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত
নিতে হতে পারে। এতে
স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ
আরও বাড়তে পারে।সব মিলিয়ে
আত্মনির্ভরতার কৌশলে অর্থনীতি সচল রাখার চেষ্টা
করছে তেহরান। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ,
নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও বৈদেশিক
মুদ্রার চাপ ইরানের অভ্যন্তরীণ
সম্পদ ও সক্ষমতার ওপর
ক্রমেই বাড়তি চাপ তৈরি করছে।সূত্র: আল জাজিরার বিশ্লেষণ