ঢাকা    রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
City News

রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কিশোর গ্যাং ও অপরাধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের মুল হোতা সুজন

তুষার পাঠান: রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের আশপাশে বাসাবো, খিলগাঁও, মগবাজার, রামপুরা, বনশ্রী ও বাড্ডার বিস্তীর্ণ এলাকায় জনবসতি ক্রমেই ঘন হয়েছে। তবে এসব ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ছিনতাই ও হত্যার মতো অপরাধের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।রাজধানীর অপরাধজগতের পরিচিত দুই নাম মিল্কী ও টিপু হত্যাকাণ্ডের পর দক্ষিণ-পূর্ব ঢাকার অপরাধ জগতের নেতৃত্বে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই শূন্যতা পূরণে নতুন করে বিভিন্ন অপরাধী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং সদস্যদের ব্যবহার করে জমি দখল, মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ এবং সড়কে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আলোচিত হলেও বাসাবো, খিলগাঁও, মগবাজার, রামপুরা, বনশ্রী ও বাড্ডার বিভিন্ন এলাকার অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণও দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী অপরাধী নেটওয়ার্কের হাতে ছিল। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান, আহমেদ মেহেদী ওরফে কলিন্স এবং কারাবন্দি সুব্রত বাইন–এর অনুসারীদের প্রভাবের কথাও স্থানীয়দের কেউ কেউ উল্লেখ করেন।তবে স্থানীয়ভাবে চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এখন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী একটি সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অপরাধচক্রের পেছনে থানা পুলিশের কোনো কোনো সদস্যের নেপথ্য সহযোগিতার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, এলাকায় অপরাধের শিকার হলেও অনেকে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে সাহস পান না। তার দাবি, অপরাধী চক্রের সঙ্গে পুলিশের কোনো কোনো সদস্যের যোগসাজশ থাকায় ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এলাকার বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে জমি দখল ও ভূমি ব্যবসার একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ঢাকা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ বাস্তবায়নের পরও বিভিন্ন জমি, খাল ও জলাভূমি নিয়ে অনিয়ম এবং দখলের অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, নিম্নাঞ্চল, খাল ও জলাধার ভরাটের কারণে রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সমস্যাও প্রকট হয়েছে।অভিযোগ রয়েছে, জমি দখল ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোর গ্যাং সদস্যদের ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাড্ডা সংলগ্ন আসিয়ান সিটি প্রকল্প দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, ওই ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কাউন্সিলর কাইয়ূমের নেতৃত্বে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ ছিল কিশোর।পরবর্তী সময়ে ওই জমি বিক্রি এবং সেখানে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং সদস্যদের ব্যবহার করার অভিযোগ ওঠে।অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত জুভেনাইল আইনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্রগুলো অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের মাদক ব্যবসা, জমি দখল, ছিনতাই ও সহিংসতার মতো অপরাধে ব্যবহার করছে। তাদের অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও তাদের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগ রয়েছে। মামলা হলেও আইনজীবীদের মাধ্যমে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে এসব কিশোর আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।এমনই একটি অপরাধচক্রের নেপথ্যে থাকা স্বাধীন রুমী সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুজনের বিরুদ্ধে খিলগাঁও, রামপুরা, বাড্ডা ও বনশ্রী এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শনের সঙ্গে সুজনের নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। বনশ্রী এলাকার দশতলা ভবনে অবস্থিত স্বাধীন রুমী সিন্ডিকেটের জমি ক্রয়-বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে সুজন ও তার সহযোগীদের ‘মাসল পাওয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুজনের প্রভাব বিস্তারের শুরুতে তার নিজস্ব কোনো বড় ধরনের পেশিশক্তি ছিল না। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক লেনদেনকে কেন্দ্র করে অংশীদারদের সঙ্গে বিরোধ ও প্রতারণার অভিযোগের মধ্য দিয়ে তিনি আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। সেই অর্থ ও প্রভাব ব্যবহার করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।অভিযোগকারীদের দাবি, সুজনের প্রভাববলয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাং পরিচালনার মতো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন, প্রভাবশালী মহলের নাম ব্যবহার এবং পুলিশকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে এলাকা ছাড়া করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।এমনই এক ভুক্তভোগী হাবিবের দাবি, সুজনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একটি জমি বিক্রির লেনদেনে তার পাওনা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি সেই অর্থ পাচ্ছেন না এবং সুজনের কাছ থেকেও কোনো সন্তোষজনক সাড়া মিলছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।সুজনের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল ও ব্যবসায়িক প্রতারণার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা। তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে।স্থানীয়দের দাবি, অপরাধী চক্রের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদেরও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। এখন অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর স্থানীয় বাসিন্দাদের।

রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কিশোর গ্যাং ও অপরাধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের মুল হোতা সুজন