ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
City News

আর কত নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু হলে টনক নড়বে বিটিআইয়ের

রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের (বিটিআই) একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। শুধুমাত্র নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকার কারণে গত ছয় থেকে সাত মাসে ভবনটিতে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই নির্মাণশ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ও দুজনের পঙ্গুত্ববরণের খবর পাওয়া গেছে। বার বার দুর্ঘটনার পরও নামী এই প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিকদের নিরাপত্তায় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে- আর কত নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হলে টনক নড়বে বিটিআইয়ের।  শুধু তাই নয়, প্রশাসনকে ম্যানেজ করে মৃত শ্রমিকের লাশ নিয়েও বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।   স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ আগস্ট দুপুরে বসুন্ধরা এলাকার কে-ব্লকের এভিনিউ-৫ এর ১৭৬ ও ১৭৭ নম্বর প্লটে বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন ভবনের ৪ তলায় কাজ করছিলেন নির্মাণ শ্রমিকরা। এ সময় লোহার রড নির্মাণাধীন ভবনের সামনের হাইভোল্টেজ বিদ্যুতের তারে লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শহিদুল ইসলাম (৩০) ছিটকে দোতলার কার্নিশে পড়ে যান। অপর শ্রমিক এরশাদুল ভবনের নিচে পড়েন। এতে দুজনই গুরুতর আহত হন।দুর্ঘটনার পর আহত দুই শ্রমিককে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে না নিয়ে ভবনের ভেতরে দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখা হয়। এক পর্যায়ে গুরুতর আহত শহীদুল ইসলাম মারা যান। পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরও বেশকিছু সময় পর আহত অপর শ্রমিক এরশাদুলকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।নিহত শহিদুলের বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা এলাকায়। হতদরিদ্র এই নির্মাণশ্রমিকের তিন শিশুসন্তান রয়েছে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে শহিদুলের পরিবার।দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অপর শ্রমিক এরশাদুলের হাত-পা ভেঙে গেছে। কোমরেও আঘাত পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ওই এলাকায় বিদুৎ বন্ধ রাখা হয়। প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে এবং দুই নির্মাণশ্রমিককে হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য যাতে সিসিটিভির ফুটেজ ধরা না পড়ে সেজন্য দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। সময় মতো হাসপাতালে নেওয়া হলে শহিদুলের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন তারা।তারা আরও অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনা ঘটলেই বিটিআই নির্মাণশ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় অথবা তাদেরকে অন্য প্রজেক্টে পাঠিয়ে দেয়, যাতে কেউ কোনো তথ্য না পায়।   ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, আমাদের ভবনের পাশেই বিটিআইয়ের ওই ভবনটি অবস্থিত।  ৬ আগস্ট দুপুর ২টার পর দুর্ঘটনার খবর পেয়েই আমি ঘটনাস্থলেই যাই। গিয়ে দেখি আহত দুই শ্রমিককে হাসপাতালে না নিয়ে ভবনের ভেতরে নিয়ে রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের পা ও হাত ভাঙা ছিল। কোমরেও আঘাত ছিল। আর যিনি কার্নিশে পড়ে গিয়েছিলেন তার হাত পোড়া ছিল। বুকেও আঘাত ছিল।ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী তিনিও ভয়ে নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর দুজন শ্রমিককে ভবনের ভেতরে নিয়ে ফেলে রাখা হয়। দ্রুত হাসপাতালে নিলে হয়তো একজনের জীবন বাঁচানো যেত। তারা অভিযোগ করে বলেন, বিটিআইয়ের নির্মাণাধীণ ওই ভবনটিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য সেফটি নেট, ফল প্রটেকশন (Fall Protection) ব্যবস্থা, রেইলিং বা বারিকোট এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) ছিল না। এমনকি ভবনের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সংযোগও ছিল চরম অরক্ষিত। দুর্ঘটনার দিন সরেজিমন গিয়ে দেখা যায়, বিটিআইয়ের নির্মাণধীন ভবনের ফটক বন্ধ। সাংবাদিক পরিচয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে সেখানে থাকা লোকজন হতচকিত হয়ে যান। দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, এখানে কেউ মারা যায়নি। দুজন ‘সামান্য’ আহত হয়েছেন, তাদেরকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।  বার বার দুর্ঘটনার পরও কেন নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করছেন না- জানতে চাইলে ভবনের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. ওয়াদুদ কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এ সময় তারা এই প্রতিবেদককে নানাভাবে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন। ঘটনার বিস্তারিত জানতে ভবনটির কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে কথা বললে তারাও মুখ খুলতে রাজি হননি। তারা জানান, দুর্ঘটনার বিষয়ে কোনো তথ্য না দিতে বিটিআইয়ের লোকজন তাদেরকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়েছে। দুর্ঘটনার পরদিন থেকে ভবনটিতে কয়েকজন ছাড়া বাকি নির্মাণশ্রমিকদের আর দেখা যায়নি। এদিকে গত শনিবার নিহত শহীদুলের বাবা জানান, আমার ছেলের মৃত্যুর পর বিটিআই কর্তৃপক্ষ আমার সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করেনি এবং আমাদের কোনো সহযোগিতাও করা হয়নি। এর আগে গত ২৭ জুন বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন এই ভবন থেকেই একইভাবে (লোহার রড বিদ্যুতের তারে লেগে) নিচের পড়ে পঙ্গুত্ববরণ আরেক নির্মাণশ্রমিক। তার নাম পরিচয় জানা না গেলেও ওইদিনের একটি ভিডিও এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সূত্রের তার বাড়ি রংপুর বলে জানা গেছে। এছাড়া ভবন নির্মাণের শুরুর দিকে (৬-৭ মাস আগে) আরও একজন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন আশপাশের ভবনের নির্মাণ শ্রমিক ও কেয়ারটেকাররা। তবে ভয়ে তারা কেউই হতাহত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হচ্ছেন না। বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন ভবনের কোনো শ্রমিকও এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না।ভাই সাজিয়ে নিহতের লাশ হস্তান্তরনিহত শহিদুলের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট অনুযায়ী, তার বাবার নাম নেসার উদ্দিন ও মায়ের নাম ফরিদা বেগম। আর লাশ শনাক্ত ও গ্রহণকারী ব্যক্তির নাম ফরিদুল ইসলাম, যিনি নিহতের আপন ভাই।  তবে অভিযোগ উঠেছে, অন্য এক ব্যক্তিকে নিহতের ভাই সাজিয়ে থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের এবং লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে বিটিআই। এ ঘটনায় ভাটারা থানা পুলিশের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।  বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, নিহত শহিদুলের সঙ্গে একই ভবনে কাজ করেন তার চাচাতো ভাই। দুর্ঘটনার পর শহিদুলকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বিটিআইয়ের লোকজনকে হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি করলে তারা কর্ণপাত করেননি। ওই সূত্রটি জানায়, সুরতহাল রিপোর্টে নিহতের ভাইয়ের যে পরিচয় দেওয়া হয়েছে তা সঠিক। তবে ফরিদুল ইসলাম স্বশরীরে থানায় কোনো অপমৃত্যু মামলা করেননি এবং তিনি লাশও গ্রহণ করেননি। অন্য একজনকে নিহতের ভাই সাজিয়ে এই নাটক মঞ্চস্থ করেছে বিটিআই।সাংবাদিককে ভয়ভীতি ও হুমকি দুর্ঘটনার পর যে সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহের জন্য বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন ওই ভবনে গিয়েছিলেন তাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।  গত রোববার একটি বিদেশি নাম্বার থেকে হোয়াটসআপে তাকে মেসেজ পাঠিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয় এবং তাকে ও তার স্ত্রী-সন্তানদের হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া গত রোববার ওই সাংবাদিকের বাসার সামনে গিয়ে কিছু লোকজন তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। পরদিন সোমবার দিনগত রাতে একটি কালো রংয়ের মাইক্রোবাসে করে ৬ জন লোক তার ও তার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর বাসার সামনে টহল দিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করে।  এ ঘটনার পর থেকে ওই সাংবাদিক নিজের ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। এর আগে বিটিআইয়ের ওই ভবনের একাধিক দুর্ঘটনার পরও শ্রমিকদের নিরাপত্তায় কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে গত শনিবার ভাটারা থানায় মামলা করতে যান ওই সাংবাদিক।  কিন্তু তার থানায় আসার খবর পেয়ে দ্রুত থানা থেকে বের হয়ে যান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম।  পরে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ওই সাংবাদিক। দুর্ঘটনার বিষয়ে ওই সাংবাদিক বলেন, ভবনটির সামনে পল্লীবিদ্যুতের হাই-ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক লাইন রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল না। শুধু তাই নয়, গত ২৭ জুন দুর্ঘটনায় একজন পঙ্গুত্ববরণ করলেও তারা ভবনটিতে নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করেনি। তখন নিরাপত্তা বেষ্টনী দিলে গত ৬ আগস্ট হয়তো এ দুর্ঘটনা ঘটতো না। তিনি আরও বলেন, গত দুটি দুর্ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী। বিটিআই শত শত কোটি টাকা খরচ করে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করলেও শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বার বার দুর্ঘটনার পরও তারা নিরাপত্তা বেষ্টনী দিতে চরম অবহেলা করেছে। শ্রমিকদের জীবনের কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। ফলে এ ধরনের মৃত্যুকে অপমৃত্যু বলার সুযোগ নাই, এটা স্রেফ হত্যাকাণ্ড।তিনি বলেন, বিটিআইয়ের মতো নামধারী প্রতিষ্ঠান কেন শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে চরম অবহেলার পরিচয় দিচ্ছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর যেন একজন নির্মাণশ্রমিকেও এভাবে জীবন দিতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এ বিষয়ে বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রজেক্ট ডিরেক্টর, সাইট ইঞ্জিনিয়ারসহ জড়িত সবার ভূমিকা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের আওতায় এনে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছেন ওই সাংবাদিক। বার বার দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহত এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফাইজুর রহমান খানের মোবাইল ফোনে একাধিক বার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।  মেসেজ পাঠালেও কোনো জবাব দেননি তিনি।   নির্মাণাধীন ওই ভবনের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. ওয়াদুদ বলেন, দুর্ঘটনার দিনই (৬ আগস্ট, বৃহস্পতিবার) বিটিআই কর্তৃপক্ষ ভিকটিমের পরিবারের সঙ্গে মিউচুয়াল করে পেমেন্ট করে দিয়েছে।  তবে গত শনিবার নিহতের পরিবার এ প্রতিবেদককে জানিয়েছে, বিটিআই তাদের কোনো সহযোগিতা করেনি। নিহতের আপন ভাইয়ের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছি কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, তার ভাইয়ের কাছে কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়নি। কিন্তু একটু পরেই তিনি আবার বলেন, নিহতের ভাইয়ের কাছেই লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। ওয়াদুদের অসামাঞ্জস্য এ বক্তব্যে শহিদুলের মৃত্যুতে অপমৃত্যু মামলা দায়ের ও লাশ হস্তান্তরে বিটিআইয়ের কারসাজি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।  এ বিষয়ে ভাটারা থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন- এ দুর্ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ঘটনার পর থানায় এক সাংবাদিক মামলা করতে গিয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, একই ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা হতে পারে না। তবে লাশ শনাক্তকারী ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে ওসি এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বেলাল দুজনের বক্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট অসঙ্গতি ছিল।

আর কত নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু হলে টনক নড়বে বিটিআইয়ের