ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩
City News

ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে নতুন যোগাযোগের পথ

দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে ভারত ও চীনের মধ্যে সাম্প্রতিক আট দফা সমঝোতা দুই দেশের যোগাযোগের নতুন কিছু পথ খুলে দিয়েছে। সামরিক হটলাইন, অতিরিক্ত সীমান্ত বৈঠকস্থল, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির তথ্য বিনিময়ের মতো উদ্যোগ আকস্মিক সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।তবে এসব উদ্যোগকে দুই দেশের সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ পুনর্মিলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, সীমান্ত বিরোধের মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত। ফলে বর্তমান উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির চেয়ে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ বাড়ানো এমনটাই প্রতীয়মান হয়।আগস্ট ২০২৬-এ বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর নেতৃত্বে দুই দেশের সীমান্তবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম বৈঠক হয়। বৈঠকের পর আট দফা সমঝোতার বিষয়টি সামনে আসে। এতে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুসরণ, ২০০৫ সালের রাজনৈতিক পরামিতি ও নির্দেশনামূলক নীতির ভিত্তিতে সীমান্ত সমাধানের চেষ্টা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমানা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।সমঝোতায় মাটির পর্যায়ের সমস্যা কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলে দ্রুত সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পূর্ব ও মধ্য সীমান্ত সেক্টরে দুটি নতুন সামরিক হটলাইন স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদের জন্য আরও দুটি বৈঠকস্থল নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এতে সীমান্তে ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক উত্তেজনা তৈরি হলে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ বাড়তে পারে।আগে ছোট সমঝোতা, পরে বড় বিরোধআট দফার তুলনামূলকভাবে নতুন ধারণাগুলোর একটি হলো ‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’। এর অর্থ হলো পুরো সীমান্ত বিরোধ একসঙ্গে সমাধানের পরিবর্তে যেসব এলাকায় মতপার্থক্য তুলনামূলক কম, সেখানে আগে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা।এর আওতায় নির্দিষ্ট এলাকার সীমা স্পষ্ট করতে মানচিত্র তৈরি এবং প্রয়োজনে সীমা চিহ্নিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বড় ও জটিল বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হবে।এ ধরনের পদ্ধতিতে কয়েক দশকের অচলাবস্থার মধ্যে ছোট ছোট বাস্তব সমঝোতার মাধ্যমে আস্থা তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। শান্তিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সামরিক উপস্থিতি ও দৈনন্দিন উত্তেজনা কমানো গেলে দুর্ঘটনাজনিত সংঘাতের ঝুঁকিও কমতে পারে।তবে এর বিপরীত আশঙ্কাও রয়েছে। আংশিক সমাধানের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে চূড়ান্ত সীমান্ত নিষ্পত্তির বদলে দুই দেশ কেবল একটি স্থায়ী ‘বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’ কাঠামোর মধ্যে আটকে যেতে পারে।২০২০-এর পর বদলেছে সম্পর্কভারত ও চীন ১৯৮১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছে। তবে ২০২০ সালের লাদাখ সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরে ২০২৪ সালের সীমান্ত টহলসংক্রান্ত সমঝোতা ও সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে।এর পর কূটনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং জনগণ-থেকে-জনগণ যোগাযোগও ধীরে ধীরে পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। তবে সীমান্ত বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতাও রয়েছে।ভারত চীনের ওপর বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। তবু দুই দেশের মধ্যে বড় আকারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপণ্য ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়েও উভয় পক্ষের উদ্বেগ রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলেই অর্থনৈতিক সম্পর্কের সব বাধা দূর হবে এমন নিশ্চয়তা নেই।নদীর পানির তথ্য বিনিময়আট দফা সমঝোতায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ও জলবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সেপ্টেম্বরেই এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠকের কথা বলা হয়েছে।হিমালয় অঞ্চলের নদীগুলো ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মতো একাধিক দেশের পানি, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ ধরনের তথ্য বিনিময় কেবল ভারত-চীন সম্পর্কের বিষয় নয়, বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র বা চীনা নামের ইয়ারলুং সাংপো নদী নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। তিব্বতে চীনের জলবিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ নিয়েও ভারত বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে কোনো প্রকল্পকে সরাসরি ‘পানি অস্ত্র’ হিসেবে দেখার আগে প্রকল্পের সক্ষমতা, পরিচালন পদ্ধতি, তথ্য বিনিময় এবং ভাটির দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব আলাদাভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।মোদি-শি বৈঠকেও সীমান্তের প্রসঙ্গ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনের প্রেক্ষাপটেও ভারত-চীন সম্পর্কের কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।উভয় পক্ষই সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে। ভারতের পক্ষ থেকে পারস্পরিক সম্মান, সংবেদনশীলতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। সীমান্তের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবেও দেখা হয়েছে।তবে সীমান্তের চূড়ান্ত সমাধান এখনো হয়নি। অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে মতবিরোধ, পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক এসব বিষয়ও দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।সামনে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়নবর্তমান আট দফা সমঝোতার গুরুত্ব তাই সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত সমাধানে নয়, বরং বিরোধকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রাখার ব্যবস্থায়। হটলাইন, সামরিক বৈঠক, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের যোগাযোগ এবং নদীর পানির তথ্য বিনিময় এসব ব্যবস্থা ভুল হিসাব থেকে সৃষ্ট সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে পারে।তবে আস্থা কেবল বৈঠক বা ঘোষণার মাধ্যমে তৈরি হয় না। মাঠপর্যায়ে দুই দেশের আচরণ, সমঝোতা বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতার ওপরও তা নির্ভর করবে।‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’ ধারণাটিও এখানেই পরীক্ষার মুখে পড়বে। সীমিত বিরোধপূর্ণ এলাকায় বাস্তব ও পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরি করা গেলে তা বৃহত্তর সীমান্ত আলোচনায় নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে। আর আংশিক সমঝোতা যদি মূল বিরোধকে শুধু ভবিষ্যতের জন্য ঠেলে দেয়, তাহলে তা চূড়ান্ত সমাধানের বদলে উত্তেজনা ব্যবস্থাপনার একটি পদ্ধতিতে পরিণত হতে পারে।ভারত-চীন সম্পর্কের বর্তমান পর্যায়কে তাই ‘সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেছে’ বলার চেয়ে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর্যায় হিসেবে দেখা যায়। ২০২৭ সালে ভারতের আয়োজনে পরবর্তী বিশেষ প্রতিনিধি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে নতুন হটলাইন কার্যকর হওয়া, সীমান্ত বৈঠকের ধারাবাহিকতা, নদীর পানির তথ্য বিনিময় এবং ‘আর্লি হার্ভেস্ট’-এর আওতায় বাস্তব অগ্রগতি এসব উদ্যোগের বাস্তবায়নই বর্তমান কূটনৈতিক অগ্রগতির স্থায়িত্ব বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে। সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, এপি নিউজ ও রয়টার্স

ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে নতুন যোগাযোগের পথ