ঢাকা    শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
City News

বিশ্বজয়ী সুরসাধক আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভিটা অবহেলায়

উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের কিংবদন্তি সাধক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। তাঁর হাত ধরেই বিশ্বমঞ্চে নতুন মর্যাদা পেয়েছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত। পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও ওস্তাদ আলী আকবর খানের মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পী তাঁর শিষ্য। মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা এই সংগীতগুরুর জন্ম ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে। দেশ-বিদেশে নানা সম্মাননায় ভূষিত এই শিল্পীর জন্মভূমিতে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের।সম্প্রতি নীরবে পেরিয়ে গেছে তাঁর ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী। স্থানীয় একটি কলেজের উদ্যোগে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ছাড়া সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজন ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তাঁর জন্মভিটায় স্মৃতি জাদুঘর ও আন্তর্জাতিক মানের সংগীত প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।আলাউদ্দিন পল্লীর উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নিস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে শিবপুরে ‘আলাউদ্দিন পল্লী’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের নামে ২২ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও এখনো বাস্তব রূপ পায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। তাঁর নিজের হাতে নির্মিত খাঁ পাড়া জামে মসজিদ ও পৈতৃক ভিটা অবহেলা ও ক্ষয়ের মুখে পড়েছে। তাঁর স্বজনদের কবর সংরক্ষণেও নেই স্থায়ী ব্যবস্থা।স্থানীয় ব্যক্তিদের মতে, এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করা না গেলে উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।পুড়ে গেছে সুরসম্রাটের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান২০১৫ সালে একদল দুষ্কৃতকারীর হামলা ও ভাঙচুরের পর আগুনে পুড়ে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ‘সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন’ ও জাদুঘর। ঘটনাটি তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়।অন্যদিকে, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্য পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও ওস্তাদ আলী আকবর খানের উদ্যোগে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অথচ সেই মহান সংগীতসাধকের জন্মভূমিতে এখনো গড়ে ওঠেনি আন্তর্জাতিক মানের সংগীত একাডেমি বা পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি জাদুঘর।স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁর অবদান ও জীবন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। এলাকার অনেক স্কুলশিক্ষার্থীই তাঁর জীবন ও কর্মের সঠিক ইতিহাস জানে না।জন্মদিন পালন নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্যসরকারিভাবে নবীনগরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মদিন পালন না হওয়ার বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক জানান, সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ একাডেমির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাঁর নির্দিষ্ট জন্মতারিখ নিয়ে সর্বসম্মত কোনো নথি নেই।স্মৃতি জাদুঘর বা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল একসময় স্থান পরিদর্শন করেছে। সে সময় উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করেছিল। তবে এরপর আর কোনো হালনাগাদ তথ্য তাদের কাছে নেই।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এলে তাঁরা প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করবেন। শিবপুরে স্মৃতি জাদুঘর বা প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হোক, উপজেলা প্রশাসনও তা চায়।তাঁকে অবহেলা করা মানে নিজেদের শিকড় অস্বীকার করাব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. আরজু বলেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা নবীনগরের নন; তিনি সমগ্র উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।তিনি বলেন, তিনি আমাদের অহংকার। তাঁকে অবহেলা করা মানে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে অস্বীকার করা। স্থানীয় প্রশাসন ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এই কিংবদন্তির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা এখন সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।নবীনগর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু কামাল খন্দকার বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হলেও এই জেলার কৃতী সন্তান ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে ধ্বংসের মুখে রয়েছে।তাঁর মতে, শিবপুরে জন্মভিটাকে পূর্ণাঙ্গ সংগীত একাডেমি ও স্মৃতি জাদুঘরে রূপ দেওয়া হলে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীরা সেখানে আসতে পারবেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবন ও অবদান সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।নবীনগর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. হোসেন শান্তি বলেন, বিশ্বখ্যাত এই সংগীতসাধকের স্মৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ বিলম্বিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্তরিকতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।নিজ জন্মভূমিতে এমন অবহেলা দুঃখজনকওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি সংসদের সভাপতি রানা শামীম রতন বলেন, নবীনগরে বহু বছর ধরেই ৮ অক্টোবর ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মদিন পালন করা হয়ে আসছে। এবারও মসজিদে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।তিনি বলেন, সরকারিভাবে জন্মদিন পালন না করা বেদনাদায়ক। বিশ্বখ্যাত এই সংগীতসাধকের নিজের জন্মভূমিতে এমন অবহেলা অত্যন্ত দুঃখজনক।ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগীতসাধনা, শিষ্যদের বিশ্বজয় এবং উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাঁর অবদান তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর জন্মভিটা, স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা ও সংগীতচর্চার ঐতিহ্য সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, এই কিংবদন্তির উত্তরাধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ কবে নেওয়া হবে।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে শিবপুরে স্মৃতি জাদুঘর ও আন্তর্জাতিক মানের সংগীত প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি এবার বাস্তবায়নের পথে এগোবে।

বিশ্বজয়ী সুরসাধক আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভিটা অবহেলায়