নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, পাঁচ দিনে আটক ৪৬৯
নোয়াখালীর
মাইজদী থেকে বেগমগঞ্জের চৌমুহনী জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছে। চুরি, ছিনতাই, সংঘর্ষ, ইভটিজিং ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে
জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছে
এসব দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত পাঁচ দিন
ধরে জেলাজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এ সময় ৪৬৯
জনকে আটক করা হয়েছে।স্থানীয়
সূত্রের দাবি, নোয়াখালীর নয়টি উপজেলায় বিভিন্ন
নামে প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। শুধু নোয়াখালী পৌরসভা
এলাকাতেই এমন দলের সংখ্যা
প্রায় ২৫। এসব দলের
আবার একাধিক উপদল রয়েছে। কিছু
দল প্রকাশ্যে তৎপরতা চালায়, আবার কিছু দল
ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের মতো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রম
পরিচালনা করে।স্থানীয়দের
অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, ছিনতাই, ইভটিজিং ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে
জড়িত। হত্যা, চাঁদাবাজি, মোটরসাইকেল ও মুঠোফোন চুরির
মতো অপরাধেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। গত এক বছরে
গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে জেলায় প্রায়
অর্ধডজন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলেও দাবি করেছেন
স্থানীয়রা।আড্ডাস্থল
স্কুলের মাঠ থেকে পার্কজেলা
শহর ও বিভিন্ন উপজেলা-পৌর এলাকার বিনোদনকেন্দ্র,
পার্ক, গলি, স্কুল-কলেজ,
হাটবাজার, সড়কের মোড়, সেতু-কালভার্ট,
চায়ের দোকান এবং পরিত্যক্ত বাড়ি
ও বাগানবাড়িতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আড্ডা দিতে দেখা যায়।
স্কুল ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠও তাদের
আড্ডাস্থলে পরিণত হয় বলে স্থানীয়দের
অভিযোগ।স্থানীয়দের
ভাষ্য, এনটিএস, বিটিআর ও কেটিজিসহ বিভিন্ন
নামে অর্ধশতাধিক গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। ছদ্মনামে পরিচালিত এসব দলের নিজস্ব
নেটওয়ার্ক ও ছোট ছোট
উপদল রয়েছে। দলগুলোর অনেক সদস্যের হাতে
দামি মুঠোফোন এবং চলাচলের জন্য
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল রয়েছে।মাইজদী
হাউসিং, পৌর পার্ক, হাসপাতাল
রোড, মুরগির ফার্ম, জহিরুল হক মিয়ার গ্যারেজ,
কোর্ট স্টেশন, নাপিতের পোল, খন্দকারপাড়া, বচিরার
দোকান, মাস্টারপাড়া, মাইজদী বাজার ও স্টেশন রোডসহ
বিভিন্ন এলাকায় তাদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দত্তবাড়ির
মোড়, দত্তেরহাট মোরগহাটা, সোনাপুর কাঠপট্টি, বিসিক শিল্পাঞ্চল ব্রিজ, কৃষ্ণরামপুর বোর্ড অফিস, হরিনারায়ণপুর ও কালিতারা বাজার
এলাকাও কিশোর গ্যাংয়ের অবস্থানস্থল হিসেবে পরিচিত।গ্রেটার
নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যিক নগরী চৌমুহনী বাজার
ও পৌর এলাকায় মাদকের
বিস্তারের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এতে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি
হয়েছে।রাজনৈতিক
পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগকিশোর
গ্যাংয়ের সদস্যদের একাংশ রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের
আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা পায়
বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, আগে ক্ষমতাসীন দলের
ছত্রচ্ছায়ায় এসব দলের সদস্যরা
অবস্থান করত। আওয়ামী লীগ
সরকারের আমলে নোয়াখালীতে কিশোর
গ্যাংয়ের তৎপরতা শুরু হয় বলেও
বিভিন্ন সূত্রের দাবি। বর্তমানে কিছু সদস্য স্থানীয়
বিএনপি নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।অভিযানে
আটক ৪৬৯কিশোর
গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে পাঁচ দিন ধরে
জেলার বিভিন্ন থানায় অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। ধারাবাহিক অভিযানে ৪৬৯ জনকে আটক
করা হয়েছে। আটকদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় অভিভাবকদের
মুচলেকা নিয়ে তাদের পরিবারের
কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যাদের
বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ বা আগের মামলা
রয়েছে, তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র
জানিয়েছে।নোয়াখালী
আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শাহাদাত হোসেন বলেন, অপরাধে জড়িত কিশোরদের আটক
রাখা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, তাদের কাউন্সেলিং
ও আইনি পরামর্শ দিয়ে
অভিভাবকদের মুচলেকায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা
হচ্ছে।তিনি
বলেন, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ
যথেষ্ট নয়। এ জন্য
পরিবার, অভিভাবক ও সমাজের সম্মিলিত
সচেতনতা এবং আন্তরিক উদ্যোগ
প্রয়োজন।নোয়াখালী
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো কিশোর হঠাৎ
অপরাধী হয়ে ওঠে না।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, খারাপ
সঙ্গ, মাদকের সহজলভ্যতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
নেতিবাচক প্রভাব কিশোরদের বিপথে নিতে পারে।কিশোরদের
মাদক ও অপরাধে ব্যবহারকারীদের
বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা
নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন
তিনি।নোয়াখালীর
পুলিশ সুপার এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন,
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এখন সামাজিক উদ্বেগের
কারণ। জেলার বিভিন্ন থানায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ শতাধিক কিশোরকে
আটক করা হয়েছে। অপরাধে
সম্পৃক্তদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে এবং সন্তানদের ওপর
কঠোর নজরদারি রাখতে অভিভাবকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।পুলিশ
সুপার আরও বলেন, কিশোরদের
এখন পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার কথা। কিন্তু তাদের
অনেকে আড্ডা, অপরাধ ও মাদকের দিকে
ঝুঁকছে। কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ সব
অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।