ঢাকা    সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
City News

গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি ও পদায়ন থেকে শুরু করে টেন্ডার এবং প্রকল্পের অর্থ ছাড় বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। এই বলয়ের সঙ্গে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তিন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নাম আলোচনায় এসেছে। অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা তাঁদের ‘তিন পাণ্ডব’ নামে অভিহিত করেন।অভিযোগের তালিকায় থাকা তিন প্রকৌশলী হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সম্প্রতি বদলি হওয়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী।সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলীর অভিযোগ, পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে প্রভাব বিস্তারের মতো ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও তাঁদের দাবি।তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সারোয়ার জাহান ও আবু নাসের চৌধুরী তা অস্বীকার করেছেন। মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।গাজীপুরের কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়ে অভিযোগমোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, জরুরি কাজের কথা বলে টেন্ডার ছাড়াই মন্ত্রীর সরকারি বাংলোর সংস্কারকাজ দেওয়া হয়। এতে ব্যয় বাড়িয়ে দেখিয়ে অর্থ ভাগাভাগি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।সাভার সার্কেলে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেজবুল কবিরকে গাজীপুরে দায়িত্ব দেওয়ার পর ঠিকাদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ বণ্টন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের একাধিক প্রকল্পে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।অভিযোগে গাজীপুরের কৃষি বিপণন ভবন নির্মাণে প্রায় ৫ কোটি টাকা, বিএসটিআই সিভিল প্রকল্পে ১৫ কোটি ৪১ লাখ, মহানগর সদর থানায় ২০ কোটি ২৪ লাখ, সদর উপজেলা মডেল মসজিদে ১৪ কোটি ৬১ লাখ, কালিয়াকৈর থানায় প্রায় ১০ কোটি, পুবাইল থানায় ১৬ কোটি ২৪ লাখ এবং কোনাবাড়ী থানায় প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।তবে এসব প্রকল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে বা একই ব্যক্তির প্রভাব ছিল এমন তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।অডিটোরিয়াম নির্মাণে বাড়তি অর্থের অভিযোগতাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু তা উপেক্ষা করে অন্য খাতের অর্থ ব্যবহার করা হয়।ঠিকাদারকে প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি বলে অভিযোগ। কাজ শেষ করতে আরও ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্প এবং পুলিশের ১০৭ থানার প্রকল্পের আওতায় ভাসানটেক থানার কাজ নিয়েও পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনের সময় ভবনের নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে বদরুল আলমকে ওএসডি করা হয়েছিল। সম্প্রতি কাজের অনিয়ম, সম্পদের হিসাব ও নারীসংক্রান্ত অভিযোগসহ বিভিন্ন বিতর্কের মধ্যে তাঁকে সংরক্ষিত/ওএসডি ধরনের পদায়নে পাঠানো হয়েছে বলেও তাঁরা জানান।প্রকৌশলীদের ‘ব্ল্যাকমেইল’ করার অভিযোগবদরুল আলমকে ঘিরে নারীকে ব্যবহার করে প্রকৌশলীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি, কোনো কোনো ঘটনায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে। এসব ঘটনা মীমাংসায় বদরুল আলম হস্তক্ষেপ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।খুলনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় দায়িত্ব পালনের সময় এক নারী তাঁকে ফোন করে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই নারী বদরুল আলমকে চিনতেন। আতিকুলের দাবি, একপর্যায়ে বদরুল তাঁকে বিষয়টি মীমাংসা করার কথা বলেন।আতিকুলের ভাষ্য, এরপর তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় ছয় মাস পর তাঁকে খুলনায় বদলি করা হয়।বদরুল আলমের বক্তব্য জানতে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।বদলি-পদায়নে সারোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগবদলি-পদায়নে অনিয়ম ঠেকাতে মন্ত্রণালয় সম্প্রতি লটারির ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, লটারির আগে ঢাকা জেলার উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে ৪১ জনের নাম বাক্সে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহানের নাম আলোচনায় এসেছে।সারোয়ারের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ উঠেছিল। গাজীপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকার সময় এক ঠিকাদারের ১০ লাখ টাকা নিরাপত্তা জামানতের পে-অর্ডার বেআইনিভাবে ভাঙানোর অভিযোগ করা হয়। ঠিকাদারের অভিযোগের পর ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে।সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এরপরও তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব দেওয়া হয়।গত ৩ মার্চ এক দিনে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলীকে বদলি করা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বদলি নীতিমালা অনুসরণ না করে পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। অভিযোগের পর মন্ত্রণালয় ওই গণবদলি আদেশ স্থগিত করে।এর আগে ৯ ডিসেম্বর মো. হাসানুজ্জামান, মো. খাইরুল ইসলাম ও মো. এরশাদুল হকের বদলি নিয়েও অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁদের বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সারোয়ার জাহান বলেন, বদলি-পদায়নের বিষয়গুলো মন্ত্রণালয় জানে। লটারির বাক্সে আগে থেকেই নাম ঢোকানোর বিষয়টি তাঁর জানা নেই। মন্ত্রণালয়ই বদলি করেছে এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের জানা আছে বলে দাবি করেন তিনি।ঢাকা সার্কেল-২ নিয়েও প্রশ্নঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীকে প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করেন অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলী। তাঁদের অভিযোগ, তিনি প্রধান প্রকৌশলীর পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন এবং একটি প্রভাবশালী বলয়কে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখেন।কাজের অগ্রগতির তুলনায় বেশি অর্থ পরিশোধ, অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দিতে নির্বাহী প্রকৌশলীদের ওপর চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর সার্কেলের বিভিন্ন কাজ নিয়ে শতাধিক অডিট আপত্তি রয়েছে বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের। এসব আপত্তিতে সরকারি অর্থের অপচয় ও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।ঢাকা সার্কেল-২-এর আওতায় সচিবালয়, হাইকোর্ট এবং আশপাশের সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব স্থাপনার সংস্কারকাজ পরিচিত ঠিকাদারদের দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। হাসপাতালের সংস্কারকাজের কোনো কোনো বিল দ্বিগুণ দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।বগুড়ায় দায়িত্ব পালনের সময় আবু নাসেরের বিরুদ্ধে টেন্ডার অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আবু নাসের বলেন, ‘স্যার আমাকে বগুড়া থেকে ঢাকা নিয়ে এসেছেন; কিন্তু কোনো সিন্ডিকেট-অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত নই।’মন্ত্রণালয় বলছে, প্রমাণ মিললে ব্যবস্থাগণপূর্ত অধিদপ্তরের এসব অভিযোগের বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে সিন্ডিকেট এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে তাঁরা বিভিন্ন অভিযোগ শুনেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনও তাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন।সচিব বলেন, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে একজন কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে ওএসডি করা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তর সরকারি ভবন নির্মাণ, সংস্কার ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে বদলি-পদায়ন, টেন্ডার এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে বদলি-পদায়নের নথি, টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্পের বিল এবং অডিট আপত্তি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়