ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
City News

চাকরির আশায় রাশিয়া, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশি তরুণ

কাজের সন্ধানে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঠাঁই হয়েছে বাংলাদেশি তরুণ রাজন হোসাইনের। রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিপত্র, বকেয়া বেতন, সামরিক পরিবেশে ভাষাগত সংকট এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর শঙ্কার মধ্যে দিন কাটছে তাঁর। তাঁর ভাষায়, রাশিয়ায় এসে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তাঁর জীবনের ‘সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত’।টাঙ্গাইলের এই তরুণ আমার দেশ-এর কাছে যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, কাজের সন্ধানে রাশিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের কেউ কেউ বিভিন্ন প্রক্রিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন, পরিচিতজন কিংবা দালাল ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে দেশটিতে পৌঁছান। পরে পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাঁদের কেউ কেউ যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।রুশ ভাষার চুক্তিপত্রে বিপাকেরাজন বলেন, তিনি নিজের ইচ্ছাতেই রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তবে পরে পরিস্থিতির কারণে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল নথিপত্র।তাঁর ভাষায়, যে কাগজপত্রে তিনি স্বাক্ষর করেছেন, সেগুলোর সবই রুশ ভাষায় লেখা ছিল। ফলে চুক্তির সব শর্ত পুরোপুরি বুঝে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিদেশে কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষরের আগে নিজের ভাষায় সেটি অনুবাদ করে বুঝে নেওয়া কতটা জরুরি, রাশিয়ায় গিয়ে তিনি তা বুঝেছেন।সামরিক পরিবেশে রুশ ভাষা না জানার কারণে যোগাযোগেও সমস্যায় পড়তে হয় বলে জানান রাজন। প্রশিক্ষণের সময় অন্যের সাহায্য নিয়ে অনেক কিছু বুঝতে হয়েছে তাঁকে।তিন মাসের বেতন বকেয়াযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বেতন নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন রাজন। তিনি বলেন, সময়মতো কিছু বেতন পেলেও বর্তমানে তাঁর তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। এই টাকা পরে পাবেন কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেও এখন পর্যন্ত কোনো পরিষ্কার সমাধান পাননি।রাজনের ভাষায়, বাইরে থেকে যুদ্ধের ভিডিও দেখা আর বাস্তবে যুদ্ধের মধ্যে থাকা এক বিষয় নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্তে অনিশ্চয়তা ও জীবনের ঝুঁকি থাকে।‘যুদ্ধ কোনো ভিডিওর দৃশ্য নয়’রাজন বলেন, ‘এখানে এসে আমি বুঝেছি, যুদ্ধ কোনো ভিডিওর দৃশ্য নয়। এর বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন।’প্রতিদিন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা, পরিবারের কথা মনে পড়া এবং কখন কী ঘটবে—এই অজানা আতঙ্কই যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন দিক বলে মনে করেন তিনি।যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন রাজন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পেরু, জিম্বাবুয়ে, শাদ ও কিউবাসহ বিভিন্ন দেশের মানুষকে তিনি সেখানে দেখেছেন। সবার আসার কারণ বা পরিস্থিতি এক নয়। তবে দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতি আলাদা হলেও ভয়, কষ্ট এবং পরিবারের জন্য উদ্বেগ প্রায় সবার মধ্যেই একই।বাংলাদেশিদের মধ্যে কেউ নিখোঁজ, কেউ নিহতরণক্ষেত্রে পরিচিত কয়েকজনের মর্মান্তিক পরিণতির কথাও জানিয়েছেন রাজন। তাঁর দাবি, সিলেটের আবু সালেহ নিখোঁজ হয়েছেন এবং বিক্রমপুরের আহমেদ সাকিব মারা গেছেন। আরও অনেকে নিখোঁজ বা হতাহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।চুক্তির পর ফিরে আসা কঠিনযুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসাও সহজ নয় বলে জানান রাজন। তাঁর মতে, চুক্তি, সামরিক নিয়ম, কাগজপত্র ও সার্বিক পরিস্থিতির কারণে ফিরে আসার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল।তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইনগত বা কূটনৈতিক সহায়তা পাওয়াও কঠিন। কারণ, চুক্তিপত্রে নিজের ইচ্ছায় ও জেনেশুনে যুদ্ধে আসার বিষয়টি উল্লেখ থাকে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে আটকে যাওয়ার পর দূতাবাসেরও করার কিছু থাকে না বলে তাঁর দাবি।রাজনের মতে, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল মারাত্মক ভুল। তবে এমন অনেক মানুষও রয়েছেন, যাঁরা ভিন্ন প্রতিশ্রুতি, ভুল তথ্য বা প্রতারণার কারণে রাশিয়ায় গিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন।টাঙ্গাইলে পরিবারের উদ্বেগরাজনের বাবা-মা ও ভাই টাঙ্গাইলে থাকেন। তাঁর ভাই রাজিব হোসাইন বলেন, ‘আমরা তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, একবার চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। তাকে নিয়ে আমরা মারাত্মক দুশ্চিন্তায় আছি।’রাজনের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, বিদেশে কাজের আশায় যাওয়া একজন তরুণ কীভাবে ভাষা, চুক্তি, বেতন, সামরিক নিয়ম এবং যুদ্ধের বাস্তবতার মধ্যে আটকে পড়তে পারেন। তাঁর নিজের উপলব্ধি, রাশিয়ায় এসে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

চাকরির আশায় রাশিয়া, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশি তরুণ