বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে অর্থসংকট, ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিলের প্রস্তাব
দেশের বেসরকারি
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থসংকটে ধীরগতির হয়ে পড়েছে। এতে
নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সম্প্রসারণের
সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি কাটাতে প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার কোটি
টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে প্রাইভেট ইকোনমিক জোনস অ্যাসোসিয়েশন অব
বাংলাদেশ (পিইজেডএবি)। পরে প্রয়োজন
ও প্রকল্পের অগ্রগতি বিবেচনায় তহবিলের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি
টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।সম্প্রতি অর্থ
বিভাগের সচিব ড. মো.
খায়রুজ্জামান মজুমদারের কাছে পাঠানো এক
চিঠিতে এ প্রস্তাব দেন
পিইজেডএবির প্রেসিডেন্ট এএসএম মাঈনুদ্দিন মোনেম। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে
এ তথ্য জানা গেছে।পিইজেডএবির প্রস্তাব
অনুযায়ী, যোগ্য বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপারদের সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৫০
শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার
কথা বলা হয়েছে। আর
অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ সুদে
পুনঃঅর্থায়ন দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।ঋণের মেয়াদ
সর্বোচ্চ ১৫ বছর করার
প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। বড় ও দীর্ঘমেয়াদি
অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ মেয়াদ ২০
বছর পর্যন্ত করার বিষয়টি বিবেচনার
কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি
চার বছরের রেয়াতকাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।পিইজেডএবি বলছে,
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার শুরুতেই বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি
বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। কিন্তু উৎপাদন
ও কারখানা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর
ধীরে ধীরে নগদ প্রবাহ
তৈরি হয়। এই ব্যবধান
পূরণে উদ্যোক্তাদের উচ্চ সুদের স্বল্পমেয়াদি
বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর
করতে হচ্ছে। এতে প্রকল্পের ব্যয়
বাড়ার পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করতেও বেশি
সময় লাগছে।প্রস্তাবিত তহবিল
থেকে ভূমি উন্নয়ন, সংযোগ
সড়ক, ড্রেনেজ, পানি ও পয়োনিষ্কাশন
ব্যবস্থা, এসটিপি, সিইটিপি, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অগ্নিনিরাপত্তা এবং আইটি ও
লজিস্টিকস অবকাঠামো তৈরিতে অর্থায়ন করা যাবে।সংগঠনটির প্রস্তাবে
বলা হয়েছে, মোট প্রকল্প ব্যয়ের
সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ঋণের
মাধ্যমে এবং অন্তত ৩০
শতাংশ ডেভেলপারের নিজস্ব মূলধন থেকে বহন করা
হবে। ঋণের অপব্যবহার ঠেকাতে
অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রকল্প মূল্যায়ন ও নিয়মিত তদারকির
পাশাপাশি কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করে ধাপে ধাপে
অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।যেসব প্রকল্পে
ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করা
হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের
বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেসব প্রকল্পকে অগ্রাধিকার
দেওয়ার কথাও জানিয়েছে পিইজেডএবি।সংগঠনটির উপদেষ্টা
মো. আব্দুল কাদের খান বলেন, বেসরকারি
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ১৩টি বেসরকারি অর্থনৈতিক
অঞ্চল লাইসেন্স পেয়েছে। আরও কয়েকটি প্রকল্প
অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।তাঁর দেওয়া
তথ্য অনুযায়ী, এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে
ইতোমধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন
ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও প্রায় ৫
বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা
রয়েছে। এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ
ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের
কর্মসংস্থান হয়েছে। পরিকল্পিত শিল্প ও অবকাঠামো পুরোপুরি
চালু হলে ৭ লাখের
বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।বর্তমানে আবদুল
মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চল, মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, আমান অর্থনৈতিক অঞ্চল,
বে অর্থনৈতিক অঞ্চল, সিটি অর্থনৈতিক অঞ্চল,
মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন, কর্ণফুলী ড্রাই
ডক স্পেশাল ইকোনমিক জোন লিমিটেড, কুমিল্লা
অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইস্ট-ওয়েস্ট স্পেশাল
ইকোনমিক জোন এবং হোসেন্দী
অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিভিন্ন পর্যায়ে শিল্প ও উৎপাদন কার্যক্রম
চলছে।অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ
অর্থনৈতিক অঞ্চল লিমিটেড, কিশোরগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল লিমিটেড ও পূর্বগাঁও অর্থনৈতিক
অঞ্চল উন্নয়নাধীন রয়েছে। চালু থাকা কয়েকটি
অর্থনৈতিক অঞ্চল, যার মধ্যে আবদুল
মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলও রয়েছে, সেগুলোতে সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের
কাজ চলছে।পিইজেডএবি জানিয়েছে,
সিটিগ্রুপসহ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ
করেছে। বর্তমানে অর্থসংকটের কারণে এসব বিনিয়োগের পরবর্তী
কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট
এএসএম মাঈনুদ্দিন মোনেমের মতে, সরকারি ও
বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড এবং হাই-টেক
পার্কের লক্ষ্য প্রায় একই হলেও অর্থায়নের
ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে।
সরকারি প্রকল্পগুলো রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, বাজেট বরাদ্দ ও তুলনামূলক সহজ
শর্তের ঋণ সুবিধা পেলেও
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিজস্ব মূলধন ও উচ্চ সুদের
বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি
অবকাঠামো গড়ে তুলতে হচ্ছে।
পিইজেডএবি
মনে করছে, প্রস্তাবিত বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু হলে এই
অর্থায়ন বৈষম্য কমার পাশাপাশি দ্রুত
শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির
পথ সহজ হবে। এ
বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের
নিয়ে দ্রুত বৈঠকের আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।