অবহেলায় ক্ষয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পি কে সেন ভবন
চট্টগ্রামের ইতিহাস
ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘পি কে সেন
সাততলা ভবন’ দীর্ঘদিনের অবহেলায়
ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কোতোয়ালি থানার সদরঘাট এলাকার কাজী নজরুল ইসলাম
সড়কের পাশে অবস্থিত এই
ভবন শুধু একটি পুরোনো
স্থাপনা নয় চট্টগ্রামের নগরজীবন,
ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থাপত্য ইতিহাসেরও
গুরুত্বপূর্ণ অংশ।ভবনটি প্রসন্ন
কুমার সেন, যিনি পি
কে সেন নামে পরিচিত
ছিলেন, তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তিনি তৎকালীন চট্টগ্রামের রাউজানের একজন ধনী ব্যবসায়ী
ও জমিদার ছিলেন।তবে ভবনটির
নির্মাণকাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, ১৮৯০ সালের দিকে
এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। তবে
এর পক্ষে এখনো নির্ভরযোগ্য লিখিত
দলিল পাওয়া যায়নি। আবার কিছু গবেষণায়
ভবনটির নির্মাণকাল ১৯২০-এর দশকের
কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা
হয়েছে। ফলে ভবনটির প্রকৃত
নির্মাণকাল নির্ধারণে পুরোনো দলিল ও নথি
নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন
রয়েছে।চট্টগ্রামের
পরিচিত স্থাপনা ছিল ভবনটিএকসময় পি
কে সেন ভবনকে চট্টগ্রামের
প্রথম সাততলা ভবন হিসেবে মনে
করা হতো। ভবনের উঁচু
গম্বুজ, চূড়া ও টাওয়ার
এটিকে আশপাশের স্থাপনা থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য
দিয়েছিল।কর্ণফুলী নদীপথে
চট্টগ্রামে আসা মানুষ ও
নাবিকদের কাছেও ভবনটি ছিল পরিচিত একটি
স্থাপনা। এর উচ্চতা ও
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের কারণে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে এটি বিশেষ স্থান
করে নিয়েছিল।ভবনটির স্থাপত্যেও
রয়েছে বৈচিত্র্য। এতে ইউরোপীয় স্থাপত্যের
প্রভাবের পাশাপাশি সনাতন বাঙালি স্থাপত্যের অলংকরণ এবং মুঘল-ইসলামি
স্থাপত্যের খিলান, গম্বুজ ও বিভিন্ন নকশার
ব্যবহার দেখা যায়।বাঁকানো বারান্দা,
অলংকৃত দেয়াল, ওপরের গম্বুজ ও টাওয়ার ভবনটির
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।অবহেলায়
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থাপনাএকসময়কার এই
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে ক্ষয়ের মুখে। ভবনের দেয়ালের বিভিন্ন অংশে গাছপালা ও
পরগাছা জন্মেছে। কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে। ছাদের
ঐতিহ্যবাহী গম্বুজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।দীর্ঘদিন যথাযথ
রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় ভবনটির
কাঠামো ও স্থাপত্য সৌন্দর্য—দুটিই ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।ভবনটির গুরুত্ব
শুধু স্থাপত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে
চট্টগ্রামের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসও
যুক্ত। দেশভাগের পর পি কে
সেন ভারতে চলে যান। পরবর্তী
সময়ে ভবনটির মালিকানা ও ব্যবহারেও পরিবর্তন
আসে। ফলে ভবনটি চট্টগ্রামের
দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী
হয়ে রয়েছে।সংরক্ষণের
দাবিএত গুরুত্বপূর্ণ
ঐতিহাসিক স্থাপনা যথাযথ সংরক্ষণের আওতায় এসেছে কি না, তা
যাচাই করা প্রয়োজন। ভবনটি
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনার তালিকায় রয়েছে কি না, সেটিও
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত করা দরকার।তবে তালিকাভুক্তির
বিষয়টি যাই হোক, ভবনটির
ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যমূল্য বিবেচনায়
নিয়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন
সংশ্লিষ্টরা।প্রথম ধাপে
ভবনটির পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত পরীক্ষা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে পুরোনো নকশা, দলিল, ছবি ও অন্যান্য
ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ করে
ভবনটির নির্মাণকাল ও ইতিহাস নির্ভুলভাবে
নির্ধারণ করা প্রয়োজন।এরপর বিশেষজ্ঞদের
পরামর্শ নিয়ে ভবনটির জরুরি
সংস্কার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম
পরিচালনা করা যেতে পারে।
মালিকানা বা আইনি কোনো
জটিলতা থাকলে সেটিও দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।জাদুঘর
বা হেরিটেজ সেন্টার করার প্রস্তাবসংরক্ষণের পর
পি কে সেন ভবনকে
ঐতিহ্য জাদুঘর, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অথবা হেরিটেজ সেন্টার
হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। এতে চট্টগ্রামের পুরোনো
নগরজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থাপত্য সম্পর্কে
নতুন প্রজন্ম জানার সুযোগ পাবে।একই সঙ্গে
ঐতিহাসিক ভবনটি চট্টগ্রামের পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।একটি পুরোনো
ভবন ভেঙে নতুন ভবন
নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু
একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে
যুক্ত ইতিহাস ও স্মৃতিও হারিয়ে
যায়। তাই চট্টগ্রামের স্থাপত্য
ও নগর ঐতিহ্যের অংশ
হিসেবে পি কে সেন
ভবন সংরক্ষণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।ঐতিহাসিক এই
স্থাপনা রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছেন
লেখক মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম।
লেখক:
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ
ইতিহাস চর্চা পরিষদ