একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, শত বছর ধরে সম্প্রীতির বন্ধন
একই
আঙিনায় পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির। একদিকে
আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে পূজার ঢাক-ঢোল। আজান
শুরু হলে বন্ধ হয়ে
যায় মন্দিরের বাদ্যযন্ত্র। নামাজ শেষ হলে আবারও
ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে
দুর্গামণ্ডপ। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা
ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে ধর্মীয়
আচার পালন করে আসছেন
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ভগবন্তপুর হাট এলাকার হিন্দু
ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।স্থানীয়
বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় এক শতাব্দী ধরে
একই আঙিনায় পাশাপাশি ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হলেও দুই সম্প্রদায়ের
মধ্যে এ নিয়ে কখনো
বিরোধ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি
হয়নি। নিজ নিজ ধর্ম
পালনের পাশাপাশি তাঁরা একে অপরের প্রতি
শ্রদ্ধাশীল থেকে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত
স্থাপন করেছেন।সম্প্রতি
ভগবন্তপুর হাট ইনসান বাইতুস
শরিফ জামে মসজিদ ও
ভগবন্তপুর হাট সার্বজনীন গোদাগাড়ী
কেন্দ্রীয় মন্দির ঘুরে দেখা যায়,
শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে সেখানে উৎসবমুখর
পরিবেশ বিরাজ করছে। মসজিদ ও মন্দিরের দূরত্ব
মাত্র পাঁচ মিটার। দুই
ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয়
রীতি মেনে চলছেন। আজানের
সময় মন্দিরের ঢাক-ঢোল ও
পূজার বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হচ্ছে।
নামাজ শেষ হলে আবার
শুরু হচ্ছে পূজার আনুষ্ঠানিকতা।মাটির
দেয়াল
ও খড়ের ছাউনি দিয়ে মসজিদ নির্মাণভগবন্তপুর
হাট এলাকার ৮০ বছর বয়সী
মইজুদ্দীন আহম্মেদ বলেন, স্থানীয় ইনসান জমিদার ১৯৬৬ সালে মন্দিরের
পাশে মাটির দেয়াল ও খড়ের ছাউনি
দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। পাশাপাশি দুই উপাসনালয় থাকলেও
দীর্ঘদিন ধরে সবাই শৃঙ্খলার
সঙ্গে নিজ নিজ ধর্ম
পালন করছেন।মইজুদ্দীন
আহম্মেদের ভাষ্য, তাঁদের এলাকায় কখনো সাম্প্রদায়িক বিভেদ
বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। পারস্পরিক
সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ
সব সময় বজায় রয়েছে।গোদাগাড়ী
কেন্দ্রীয় মন্দিরের সভাপতি শ্রী শান্ত কুমার
মজুমদার বলেন, মন্দিরটির বয়স শত বছরেরও
বেশি। তাঁর দাদা আদ্যনাথ
মজুমদার ব্রিটিশ আমলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা
করেন।তিনি
বলেন, তাঁরা নির্ধারিত সময়ে পূজা করেন,
আর মুসলমানেরা তাঁদের সময়ে নামাজ আদায়
করেন। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ
মিলেমিশে বসবাস করছেন।আজানের সময়
বন্ধ
থাকে
বাদ্যযন্ত্রইনসান
বাইতুস শরিফ জামে মসজিদের
ইমাম মাওলানা মো. শাহালাল বলেন,
মসজিদের পাশেই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটি মসজিদের আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
এখানে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবাই
নিজ নিজ ধর্ম পালন
করেন।তিনি
বলেন, আজান ও নামাজের
সময় মন্দিরের লোকজন ঢাক-ঢোল বন্ধ
রাখেন। পাশাপাশি দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
থাকা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে কোনো সমস্যা হয়
না।স্থানীয়
বাসিন্দা অধীর চন্দ্র বলেন,
প্রশাসনের পাশাপাশি এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও তাঁদের সহযোগিতা করেন। আজান ও নামাজের
সময় তাঁরা বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন। দুই
সম্প্রদায়ের মানুষ ভাইয়ের মতো মিলেমিশে বসবাস
করছেন।তবে
শতবর্ষী মন্দিরটির উন্নয়নে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে উপকার হবে
বলে মনে করেন স্থানীয়
সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।মন্দিরের
পুরোহিত পলাশ প্রতিম মজুমদার
বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যে চিত্র তুলে
ধরা হয়, এই এলাকায়
তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়।সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে
রাখার
প্রত্যয়গোদাগাড়ী
পৌরসভার সাবেক মেয়র আনোয়ারুল চৌধুরী
বলেন, পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দিরে দুই
সম্প্রদায়ের মানুষ নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার পালন করেন।
এ পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে কোনো ঝগড়া-বিভেদের
ঘটনা ঘটেনি। বরং একে অপরকে
সহযোগিতা করে আসছেন তাঁরা।দীর্ঘদিন
ধরে পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এই
সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারায়
গর্ব প্রকাশ করেন তিনি।গোদাগাড়ী
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান বলেন, পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে
দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্ম
পালন করছেন। তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের উজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত।এবারের
দুর্গাপূজা উপলক্ষে উপজেলার ৪২টি মন্দিরের পূজামণ্ডপে
নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলেও
জানান তিনি।