ঢাকা    শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
City News

অপমানিত দরবেশ, পুড়ে যাওয়া প্রাসাদ এবং পটিয়ার কুরাকাটনী মসজিদের ইতিহাস

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার দক্ষিণ হরিণখাইন গ্রামে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো একটি মসজিদ। নাম কুরাকাটনী মসজিদ। স্থানীয়ভাবে এটি ‘লাকসা জামে মসজিদ’ নামেও পরিচিত। ১২২২ হিজরি, অর্থাৎ ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল ওয়াহাব মুন্সী এই মসজিদ নির্মাণ করেন।তবে এই মসজিদের ইতিহাস শুধু নির্মাণকাল, স্থাপত্য বা ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ প্রচলিত কাহিনি—যেখানে আছে এক নিরক্ষর কিশোরের জীবনের পরিবর্তন, খ্যাতি ও সম্পদের উত্থান, অহংকারে পতন, অনুশোচনা এবং আত্মশুদ্ধির গল্প। এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক সাধক হযরত শাহ সূফী আমানত খান (র.)-এর নাম।অক্ষরজ্ঞানহীন সেই কিশোরই হয়ে ওঠেন আইনজীবীআব্দুল ওয়াহাবের মা খোসামাবুদি ছিলেন একজন বিধবা নারী। হযরত শাহ সূফী আমানত খান (র.)-এর দরবার ও পরিবারের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে খেদমত করতেন।তাঁর ছেলে আব্দুল ওয়াহাবের তখন কোনো অক্ষরজ্ঞান ছিল না। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন খোসামাবুদি একদিন হযরত শাহ আমানত (র.)-এর কাছে আবেদন করেন, তাঁর ছেলের জন্য যেন কোনো কাজ বা রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত শাহ আমানত (র.) আব্দুল ওয়াহাবকে ‘ওকালতি’ করার নির্দেশ দেন। এরপর বদলে যায় তাঁর জীবন। যে কিশোরের কোনো অক্ষরজ্ঞান ছিল না, সময়ের ব্যবধানে তিনিই তৎকালীন চট্টগ্রামের একজন খ্যাতনামা ও প্রভাবশালী আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।সাফল্য এল, সঙ্গে এল পরিবর্তনওখ্যাতি, অর্থ, সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তি- সবকিছুই একে একে অর্জন করেন আব্দুল ওয়াহাব। কিন্তু প্রচলিত এই কাহিনি অনুযায়ী, সাফল্যের সঙ্গে তাঁর জীবনযাপনেও পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে তিনি নিজের অতীত এবং সাধারণ মানুষের কথা ভুলতে শুরু করেন। বিত্তশালী ও প্রভাবশালী মহলে তাঁর ওঠাবসা বাড়তে থাকে। একসময় তাঁর মধ্যে তৈরি হয় আত্মকেন্দ্রিকতা ও অহংকার।হযরত শাহ আমানত (র.) তাঁর এই পরিবর্তন উপলব্ধি করেছিলেন বলে প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। প্রিয় শাগরেদের এই নৈতিক পরিবর্তনে তিনি ব্যথিত হন। এরপর আব্দুল ওয়াহাব তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িতে চট্টগ্রামের বিত্তবান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জন্য একটি বড় জিয়াফতের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি তাঁর মোর্শেদ হযরত শাহ আমানত (র.)-কে আমন্ত্রণ জানান।ধনী-দরিদ্রের জন্য একই ভোজের কথা ছিল, কিন্তু...হযরত শাহ আমানত (র.) তাঁকে পরামর্শ দেন, কেবল বিত্তবানদের জন্য নয়- সর্বসাধারণের জন্য জিয়াফতের আয়োজন করতে। আব্দুল ওয়াহাব তাঁকে আশ্বস্ত করেন, ধনী-দরিদ্র সবাই একইভাবে খাবেন। তাঁর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত হযরত শাহ আমানত (র.) অনুষ্ঠানে যাওয়ার সম্মতি দেন।জিয়াফতের দিন আব্দুল ওয়াহাবের বাড়িতে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। সুদৃশ্য মঞ্চ তৈরি করা হয়। মঞ্চের চারপাশে দারোয়ান মোতায়েন করা হয়। চট্টগ্রামের নামী-দামি অতিথিরা অপেক্ষা করতে থাকেন হযরত শাহ আমানত (র.)-এর আগমনের জন্য।এর মধ্যেই জীর্ণ পোশাক পরা এক শীর্ণকায় দরবেশ ভিড়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁর পোশাক ও চেহারা দেখে দারোয়ানরা তাঁকে বাধা দেয়। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দরবেশটি কোনো প্রতিবাদ না করে চলে যান। কিছুক্ষণ পর জানা যায়, হযরত শাহ আমানত (র.) প্রধান ফটক থেকেই ফিরে গেছেন। তখন আব্দুল ওয়াহাব বুঝতে পারেন- দারোয়ানরা যাঁকে জীর্ণবেশী দরবেশ ভেবে অপমান করে ফিরিয়ে দিয়েছে, তিনি ছিলেন স্বয়ং তাঁর মোর্শেদ।অপমানের পরই আগুনে ভস্মীভূত হয় প্রাসাদপ্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, এরপরই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। আব্দুল ওয়াহাবের বিলাসবহুল প্রাসাদে আগুন লাগে। অল্প সময়ের মধ্যে আগুনে পুড়ে যায় পুরো প্রাসাদ। ভেস্তে যায় জাঁকজমকপূর্ণ জিয়াফতের আয়োজনও। পরদিন অনুতপ্ত আব্দুল ওয়াহাব হযরত শাহ আমানত (র.)-এর খানকাহ শরীফে হাজির হন। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি ক্ষমা চান।তখন হযরত শাহ আমানত (র.) তাঁকে বলেন-হায় ওয়াহাব! আমার এতটা বারণ তুমি শুনলে না। একসঙ্গে ধনী ও গরিবকে এক কাতারে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো মানসিকতা বা সামর্থ্য তোমার তৈরি হয়নি।প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, এরপর হযরত শাহ আমানত (র.) তাঁর অহংকারের পরিণতি সম্পর্কে বলেন, আব্দুল ওয়াহাবের পরবর্তী সাত পুরুষ পর্যন্ত প্রতি প্রজন্মে একজন করে পুরুষ সদস্য মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে জন্ম নেবে। একই সঙ্গে তাঁকে নিজের গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়- আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর ঘরের খেদমতের উদ্দেশ্যে।মোর্শেদের নির্দেশে গড়ে ওঠে কুরাকাটনী মসজিদহযরত শাহ আমানত (র.)-এর নির্দেশের পর আব্দুল ওয়াহাব মুন্সীর জীবনে পরিবর্তন আসে বলে প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ধর্মীয় জীবনে ফিরে আসেন এবং নিজের গ্রামে মসজিদ নির্মাণ করেন।১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে পটিয়ার দক্ষিণ হরিণখাইনে নির্মিত সেই মসজিদই পরবর্তীতে ‘কুরাকাটনী মসজিদ’ নামে পরিচিত হয়। স্থানীয়ভাবে এটি ‘লাকসা জামে মসজিদ’ নামেও পরিচিত। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে মসজিদটি চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে টিকে আছে।সাত পুরুষের বংশকাহিনিকুরাকাটনী মসজিদের প্রচলিত ইতিহাসের সঙ্গে আব্দুল ওয়াহাবের বংশধরদের একটি কাহিনিও যুক্ত রয়েছে। বংশের লোকজনের দাবি, হযরত শাহ আমানত (র.)-এর সেই ঘোষণার পর আব্দুল ওয়াহাবের বংশের প্রতিটি প্রজন্মে একজন করে পুরুষ সদস্য মানসিক ভারসাম্যহীনতা নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন।কিছুদিন আগে এই বংশের সপ্তম পুরুষ ‘মোহাম্মদ’ মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বলে বংশের লোকজন জানান। তাঁদের দাবি, এর মধ্য দিয়ে সাত পুরুষের সেই সময়সীমা পূর্ণ হয়েছে। বর্তমানে এই বংশে আর কোনো মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নেই বলেও তাঁরা জানান।ইতিহাস, বিশ্বাস ও জনশ্রুতির এক স্মারককুরাকাটনী মসজিদের ইতিহাসে একই সঙ্গে রয়েছে একটি প্রাচীন স্থাপনা, এক আধ্যাত্মিক সাধককে ঘিরে প্রচলিত কাহিনি, এক নিরক্ষর কিশোরের উত্থান, সাফল্যের পর অহংকার এবং আত্মশুদ্ধির গল্প। স্থানীয় মানুষের কাছে এই মসজিদ তাই শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। প্রায় দুই শতাব্দী পেরিয়েও দক্ষিণ হরিণখাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কুরাকাটনী মসজিদ আজও বহন করে চলেছে সেই দীর্ঘ ইতিহাসের স্মৃতি।সূত্র: ‘হযরত শাহ সূফী আমানত খান (র.)’ গ্রন্থে শাহজাদা আমান উদ্দিন আব্দুল্লাহর লেখা থেকে সংগৃহীত।লেখক পরিচিতিমোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম সম্পাদক, লিটল ম্যাগাজিন ‘চট্টলানামা’ সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ  

অপমানিত দরবেশ, পুড়ে যাওয়া প্রাসাদ এবং পটিয়ার কুরাকাটনী মসজিদের ইতিহাস