ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
City News

এগারসিন্দুরের শাহ মোহাম্মদ মসজিদ ও বালাখানা

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন



ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন
মো. রাকিবুল ইসলাম। ফিচার লেখক

বাংলার ইতিহাসের প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অতীতের অসংখ্য স্মৃতি। কোথাও প্রাচীন দুর্গ, কোথাও মন্দির, কোথাও আবার শত শত বছরের পুরোনো মসজিদ- যেগুলো শুধু স্থাপনা নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি স্থাপত্য ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক এগারসিন্দুর গ্রাম ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। সেখানে অবস্থিত শাহ মোহাম্মদ মসজিদ এর ঐতিহ্যবাহী প্রবেশদ্বারবালাখানাদেখে উপলব্ধি করেছি, আমাদের ঐতিহ্যের কত মূল্যবান সম্পদ এখনো নীরবে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, শাহ মোহাম্মদ মসজিদটি আনুমানিক ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার শায়েস্তা খাঁর শাসনামলে নির্মিত হয়। এর নির্মাতা ছিলেন এগারসিন্দুরের তৎকালীন ধনাঢ্য বণিক শেখ মাহমুদ। তাঁর নামানুসারেই মসজিদটি স্থানীয়ভাবে শাহ মাহমুদ মসজিদ বা শাহ মোহাম্মদ মসজিদ নামে পরিচিত। ইউনেস্কোর মুসলিম স্থাপত্য-সংক্রান্ত তালিকাতেও এটিশাহ মোহাম্মদ মসজিদনামে নিবন্ধিত রয়েছে।

একসময় এগারসিন্দুর ছিল বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রধান নেতা ঈশা খাঁর দুর্গনগর এবং পূর্ব বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। নদীপথকেন্দ্রিক এই জনপদে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি গড়ে ওঠে সমৃদ্ধ জনবসতি এবং ইসলামী স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। শাহ মোহাম্মদ মসজিদ সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীতেরই এক মূল্যবান স্মারক।

মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের আগে দর্শনার্থীর চোখে পড়ে এর ব্যতিক্রমধর্মী প্রবেশদ্বারবালাখানা পূর্বদিকে অবস্থিত এই পাকা দোচালা স্থাপনাটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ ঘরের আদলে নির্মিত হলেও সম্পূর্ণ ইটের তৈরি। বাংলার লোকজ স্থাপত্য মুঘল নকশাশৈলীর অপূর্ব সমন্বয় এই বালাখানাকে দেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক স্থাপনায় পরিণত করেছে।

সামান্য উঁচু চত্বরের ওপর নির্মিত বর্গাকার মসজিদটির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২ ফুট। পুরো স্থাপনাটি একটি বৃহৎ গম্বুজে আচ্ছাদিত। চার কোণায় রয়েছে চারটি অষ্টভুজাকার বুরুজ, যা ছাদ অতিক্রম করে উপরে উঠে ছোট ছত্রীতে সমাপ্ত হয়েছে। পূর্ব দেয়ালে তিনটি খাঁজকাটা প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেয়ালে তিনটি নান্দনিক মিহরাব মসজিদের স্থাপত্য সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দেয়াল মিহরাবে পোড়ামাটির ফুল, লতাপাতা জ্যামিতিক অলংকরণ মুঘল আমলের শিল্পরুচির অসাধারণ নিদর্শন বহন করে।

বর্তমানে শাহ মোহাম্মদ মসজিদ বালাখানা বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে রক্ষিত রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ পরিচর্যার ফলে আজও এর ঐতিহাসিক সৌন্দর্য অনেকটাই অক্ষুণ্ণ রয়েছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, স্থাপত্যবিদ ভ্রমণপিপাসু মানুষ এই নিদর্শন দেখতে আসেন।

শাহ মোহাম্মদ মসজিদ বালাখানা শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্য, শিল্পবোধ এবং অতীতের সমৃদ্ধ সভ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। আমাদের ইতিহাসকে জানতে, নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে ধরনের প্রত্নসম্পদের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস হারিয়ে গেলে তা আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না, কিন্তু সংরক্ষণ করা গেলে তা যুগের পর যুগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অতীতের গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।

মো. রাকিবুল ইসলাম
ফিচার লেখক
সহকারী মহাব্যবস্থাপক, ভাইয়া ব্রডকাস্ট লি.

 

বিষয় : ইতিহাস প্রাচীন দুর্গ বালাখানা ঐতিহ্য

City News

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬


ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাংলার ইতিহাসের প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অতীতের অসংখ্য স্মৃতি। কোথাও প্রাচীন দুর্গ, কোথাও মন্দির, কোথাও আবার শত শত বছরের পুরোনো মসজিদ- যেগুলো শুধু স্থাপনা নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি স্থাপত্য ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক এগারসিন্দুর গ্রাম ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। সেখানে অবস্থিত শাহ মোহাম্মদ মসজিদ এর ঐতিহ্যবাহী প্রবেশদ্বারবালাখানাদেখে উপলব্ধি করেছি, আমাদের ঐতিহ্যের কত মূল্যবান সম্পদ এখনো নীরবে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, শাহ মোহাম্মদ মসজিদটি আনুমানিক ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার শায়েস্তা খাঁর শাসনামলে নির্মিত হয়। এর নির্মাতা ছিলেন এগারসিন্দুরের তৎকালীন ধনাঢ্য বণিক শেখ মাহমুদ। তাঁর নামানুসারেই মসজিদটি স্থানীয়ভাবে শাহ মাহমুদ মসজিদ বা শাহ মোহাম্মদ মসজিদ নামে পরিচিত। ইউনেস্কোর মুসলিম স্থাপত্য-সংক্রান্ত তালিকাতেও এটিশাহ মোহাম্মদ মসজিদনামে নিবন্ধিত রয়েছে।

একসময় এগারসিন্দুর ছিল বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রধান নেতা ঈশা খাঁর দুর্গনগর এবং পূর্ব বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। নদীপথকেন্দ্রিক এই জনপদে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি গড়ে ওঠে সমৃদ্ধ জনবসতি এবং ইসলামী স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। শাহ মোহাম্মদ মসজিদ সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীতেরই এক মূল্যবান স্মারক।

মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের আগে দর্শনার্থীর চোখে পড়ে এর ব্যতিক্রমধর্মী প্রবেশদ্বারবালাখানা পূর্বদিকে অবস্থিত এই পাকা দোচালা স্থাপনাটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ ঘরের আদলে নির্মিত হলেও সম্পূর্ণ ইটের তৈরি। বাংলার লোকজ স্থাপত্য মুঘল নকশাশৈলীর অপূর্ব সমন্বয় এই বালাখানাকে দেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক স্থাপনায় পরিণত করেছে।

সামান্য উঁচু চত্বরের ওপর নির্মিত বর্গাকার মসজিদটির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২ ফুট। পুরো স্থাপনাটি একটি বৃহৎ গম্বুজে আচ্ছাদিত। চার কোণায় রয়েছে চারটি অষ্টভুজাকার বুরুজ, যা ছাদ অতিক্রম করে উপরে উঠে ছোট ছত্রীতে সমাপ্ত হয়েছে। পূর্ব দেয়ালে তিনটি খাঁজকাটা প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেয়ালে তিনটি নান্দনিক মিহরাব মসজিদের স্থাপত্য সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দেয়াল মিহরাবে পোড়ামাটির ফুল, লতাপাতা জ্যামিতিক অলংকরণ মুঘল আমলের শিল্পরুচির অসাধারণ নিদর্শন বহন করে।

বর্তমানে শাহ মোহাম্মদ মসজিদ বালাখানা বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে রক্ষিত রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ পরিচর্যার ফলে আজও এর ঐতিহাসিক সৌন্দর্য অনেকটাই অক্ষুণ্ণ রয়েছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, স্থাপত্যবিদ ভ্রমণপিপাসু মানুষ এই নিদর্শন দেখতে আসেন।

শাহ মোহাম্মদ মসজিদ বালাখানা শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্য, শিল্পবোধ এবং অতীতের সমৃদ্ধ সভ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। আমাদের ইতিহাসকে জানতে, নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে ধরনের প্রত্নসম্পদের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস হারিয়ে গেলে তা আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না, কিন্তু সংরক্ষণ করা গেলে তা যুগের পর যুগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অতীতের গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।

মো. রাকিবুল ইসলাম
ফিচার লেখক
সহকারী মহাব্যবস্থাপক, ভাইয়া ব্রডকাস্ট লি.

 


City News


কপিরাইট © ২০২৬ City News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন
0:00 0:00
1.0x