জুলাই বিপ্লবের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় নগরের রাজনীতি জমে উঠেছে।
জামায়াতে ইসলামী
ইতিমধ্যে মেয়র পদে একক
প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এনসিপিও তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। তবে বিএনপিতে একাধিক
নেতা আলোচনায় থাকলেও এখনো প্রার্থী নির্ধারণ
হয়নি।
১২ ফেব্রুয়ারির
সংসদ নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক সরকার
দায়িত্ব নেওয়া এবং নির্বাচন কমিশনের
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের
তৎপরতা বেড়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই দলীয় মনোনয়ন
পাওয়ার প্রত্যাশায় বিভিন্ন দলের নেতারা নিজেদের
অবস্থান জানান দিতে মাঠে নেমেছেন।
বিএনপিতে মেয়র
পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, জেলা বিএনপির প্রথম
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী, জেলা বিএনপির সভাপতি
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ
সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী এবং কেন্দ্রীয় মহিলা
দলের সহসভাপতি ও জেলা বিএনপির
সহসভাপতি সামিয়া বেগম চৌধুরী। এ
ছাড়া আরও কয়েকজনের নাম
নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে বিএনপির
প্রার্থী বাছাইয়ে নতুন কিছু হিসাব
যুক্ত হয়েছে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে দলের কয়েকজন নেতাকে
ইতিমধ্যে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে সিসিক
প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। জেলা পরিষদের প্রশাসক
আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট
ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী এবং জালালাবাদ গ্যাসের
পরিচালক বদরুজ্জামান সেলিম।
এ কারণে
বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নে সাংগঠনিক অবস্থান, অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা, জনসম্পৃক্ততা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের
দায়িত্বে থাকা নেতাদের বিষয়গুলো
বিবেচনায় আসছে বলে দলীয়
সূত্রে জানা গেছে।
জামায়াতের
প্রার্থী নুরুল ইসলাম বাবুল
সিলেট সিটি
করপোরেশনের মেয়র পদে একক
প্রার্থী হিসেবে মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির ড. নুরুল
ইসলাম বাবুলের নাম ঘোষণা করেছে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই তিনি
গণসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
ড. নুরুল
ইসলাম বাবুল বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তে তাঁর
নাম মেয়র প্রার্থী হিসেবে
ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর
দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা তাঁর
পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয় হয়েছেন। দেশ-বিদেশে থাকা
শুভাকাঙ্ক্ষীরাও পাশে থাকার প্রত্যয়
জানিয়েছেন।
তরুণদের মধ্যে
যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তাতে
তিনি আশাবাদী বলে জানান। তরুণ
প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে সুন্দর ও
সম্ভাবনাময় নগর গড়ে তুলতে
চান তিনি।
এনসিপির
প্রার্থী আফজাল
এনসিপির পক্ষ
থেকে সিলেট মহানগর শাখার আহ্বায়ক আব্দুর রহমান আফজালকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা
করা হয়েছে। গত ২৯ মার্চ
দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে তাঁর নাম ঘোষণা
করা হয়।
আব্দুর রহমান
আফজাল বলেন, প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই তিনি
নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। জনগণ এনসিপির কার্যক্রম
গ্রহণ করছে উল্লেখ করে
তিনি ভোটারদের সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে
নাগরিক সেবায় কাজ করার প্রত্যাশা
ব্যক্ত করেন।
বিএনপির
নেতাদের প্রত্যাশা
জেলা বিএনপির
প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, দলীয় নেতা-কর্মী
ও সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে আলেমসহ বিভিন্ন
ধর্ম ও মতের মানুষের
কাছ থেকে তিনি সমর্থন
পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ
করা এবং জনগণের সঙ্গে
তাঁর সম্পৃক্ততা দল মূল্যায়ন করবে
বলে আশা করেন তিনি।
বর্তমান মন্ত্রী ও সাবেক মেয়র
আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনে
সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে চান
তিনি।
মহানগর বিএনপির
সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, জনপ্রতিনিধি হয়ে মানুষের জন্য
কাজ করার সুযোগ পেলে
তা কাজে লাগাতে চান।
দলের কঠিন সময়ে ভূমিকা
রাখা, করোনা ও বন্যায় মানুষের
পাশে দাঁড়ানো এবং চাঁদাবাজদের প্রশ্রয়
না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন,
দল সুযোগ দিলে নগরবাসীর জন্য
কাজ করবেন।
মহানগর বিএনপির
সভাপতি নাছিম হোসাইন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় রয়েছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের
আস্থা ও ভালোবাসায় নির্বাচিত
হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। দল
তাঁকে সুযোগ দিলে জনগণের পাশে
থেকে কাজ করতে চান।
কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, তিনি সিলেট সিটির
৪২টি ওয়ার্ডে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছেন এবং
জনগণের ভালোবাসা ও সহযোগিতা পাচ্ছেন।
তবে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে দলের সিদ্ধান্তই তাঁর
কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগ পেলে সিলেটকে আধুনিক,
সুন্দর ও জনবান্ধব নগর
হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ
করবেন।
কেন্দ্রীয় মহিলা
দলের সহসভাপতি সামিয়া বেগম চৌধুরী বলেন,
দলের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে
যুক্ত রয়েছেন। দল তাঁকে সুযোগ
দিলে নারীসহ নগরবাসীর জন্য নিরাপদ ও
বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে
কাজ করতে চান।
সব
মিলিয়ে আওয়ামী লীগবিহীন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়
সিলেট সিটি নির্বাচন সামনে
রেখে বিএনপির মনোনয়ন-সমীকরণ, জামায়াতের একক প্রার্থী এবং
এনসিপির মাঠের তৎপরতা নগর রাজনীতিতে নতুন
মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।